প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের মাঠ পর্যায়ের ভূমি সেবাকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সব উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা ডিভাইস স্থাপন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত তা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমি অফিসে কর্মরতদের উপস্থিতি আরও নিয়মতান্ত্রিক করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সময়মতো সেবা দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-২ শাখা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্রে দেশের সব জেলা প্রশাসককে নিজ নিজ জেলার আওতাধীন উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা ডিভাইস স্থাপন এবং সেগুলোর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ডিভাইস স্থাপন করলেই হবে না, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে নিয়মিতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হাজিরা ব্যবস্থার আওতায় থাকেন, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমি অফিস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোর অন্যতম। জমির নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান, রেকর্ডসহ বিভিন্ন ধরনের ভূমিসেবা নিতে মানুষকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিসে যেতে হয়। জমি-সংক্রান্ত কাজ অনেক পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এসব সেবা পেতে সামান্য বিলম্বও অনেক সময় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার মানুষকে একটি কাজের জন্য একাধিকবার অফিসে যাতায়াত করতে হলে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়।
এ কারণে ভূমি সেবা প্রদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিয়মিত ও সময়মতো উপস্থিত থাকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে মন্ত্রণালয়। পরিপত্রে বলা হয়েছে, জনসাধারণ যাতে নির্বিঘ্নে এবং যথাসময়ে ভূমি সেবা পেতে পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি জরুরি। বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই উপস্থিতি আরও সুশৃঙ্খলভাবে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারি অফিসগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবেই ভূমি অফিসগুলোতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব করার যে প্রচেষ্টা চলছে, বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা তারই একটি অংশ। প্রচলিত হাজিরা পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতির তথ্য সংরক্ষণ করা হলে কর্মস্থলে উপস্থিতি ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
পরিপত্রে জেলা প্রশাসকদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিজ নিজ জেলার সব উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দ্রুত বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা ডিভাইস স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে স্থাপিত ডিভাইসগুলো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত ব্যবহার করছেন কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলা পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশের আওতায় উপজেলা ভূমি অফিসের পাশাপাশি ইউনিয়ন ভূমি অফিসও রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব অফিস সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও সেবাদানের ধারাবাহিকতা সরাসরি স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষক, জমির মালিক কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া কোনো পরিবারের সদস্যকে ভূমি-সংক্রান্ত কাজে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যেতে হয়। অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতি বা সেবা পেতে বিলম্ব হলে তাদের জন্য বাড়তি সময় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যার সবগুলো সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা অবশ্য নেই। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়মতান্ত্রিক করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারে। উপস্থিতির তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হলে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহির সুযোগও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত অফিস করার বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আরও সচেতনতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ভূমি নিয়ে মানুষের অভিযোগের মধ্যে সেবা পেতে দেরি, একাধিকবার অফিসে যাওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যথাসময়ে না পাওয়ার মতো বিষয়ও উঠে আসে। যদিও এসব সমস্যার প্রকৃতি ও কারণ স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবু অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম মৌলিক শর্ত।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শুধু প্রযুক্তি স্থাপনের দিকে নজর দিলে চলবে না; এর কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কোনো সরকারি অফিসে ডিভাইস স্থাপন করা হলেও যদি তা নিয়মিত ব্যবহার না করা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এ কারণে পরিপত্রে ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্রের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সিস্টেম অ্যানালিস্টসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে এ নির্দেশনার অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। এর ফলে জেলা থেকে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রশাসনিক সমন্বয় কাঠামো তৈরি হয়েছে।
ভূমি অফিসে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি সেবার সঙ্গে প্রযুক্তির আরও নিবিড় সংযোগ তৈরি করা। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে। এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিও প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হলে পুরো সেবা কাঠামোকে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, সরকারি কোনো সেবা নিতে গিয়ে যেন অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না হয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত সেবায় একটি ছোট কাজের জন্য বারবার অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে সেবা গ্রহণকারীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ে সেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে এর সঠিক বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর। ডিভাইসগুলো সচল রাখা, উপস্থিতির তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রযুক্তিটি যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশকে মাঠ পর্যায়ের ভূমি প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং ভূমি অফিসের কর্মপরিবেশ আরও নিয়মতান্ত্রিক করার সুযোগ তৈরি হবে। শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুফল তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন একজন সাধারণ নাগরিক নির্ধারিত সময়ে ভূমি অফিসে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে পাবেন এবং অযথা বিলম্ব ছাড়াই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।