প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে নিজের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে অর্থ পাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে সরকার। বিশেষ প্রণোদনা ব্যবস্থার আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী গ্রাহকের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সুবিধা পেতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সোলার সিস্টেম স্থাপন করে নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় যারা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করবেন, তারা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালের মধ্যে সোলার সিস্টেম স্থাপন ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারবেন। এ ব্যবস্থার সুবিধা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত পাওয়ার কথা রয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এ-সংক্রান্ত বিশেষ প্রণোদনার প্রজ্ঞাপন কার্যকর হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটেও রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনার প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন ভবনের অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা এবং জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো। একই সঙ্গে গ্রাহকের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন ব্যবস্থায় একজন গ্রাহক তার ভবনের ছাদে প্রয়োজনীয় সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপন করবেন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে ওই গ্রাহকের নিজস্ব ব্যবহারে যাবে। ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকলে তা নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। নেট মিটারিংয়ের মূল ধারণাই হলো, গ্রাহক নিজের স্থাপনায় নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজে ব্যবহার করবেন এবং উদ্বৃত্ত অংশ বিতরণ গ্রিডে পাঠাবেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষ প্রণোদনা কাঠামো অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা হিসাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে নির্ধারিত মুনাফা ও প্রিমিয়াম যোগ করে গ্রিডে সরবরাহ করা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা প্রতি ইউনিট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ব্যয়ের তুলনায় কম খরচে কোনো গ্রাহক সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে পারলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ তার আর্থিক সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এখানে গ্রাহকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ছাদে সৌর প্যানেল বসালেই বিশেষ প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পুরো সিস্টেম স্থাপন করতে হবে এবং তা অনুমোদিত নেট মিটারিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিকে সংশ্লিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আগে ভবনের ছাদে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত জায়গা রয়েছে কি না, সেটি যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। ছাদে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় কি না, প্যানেল স্থাপনের কাঠামোগত নিরাপত্তা কেমন, কত ক্ষমতার সিস্টেম স্থাপন করা সম্ভব এবং ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন কী—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। নেট মিটারিংয়ের আওতায় সাধারণভাবে ভবনের ছাদসহ উপযুক্ত জায়গায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে এবং গ্রাহককে নিজস্ব স্থাপনায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে ব্যবহার করে অতিরিক্ত অংশ গ্রিডে সরবরাহ করতে হয়।
সরকারের নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থায় সোলার প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারি, ইনভার্টার ও মিটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের মানের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নির্ধারিত কারিগরি মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। নেট মিটারিংয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সোলার মডিউল ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে। স্রেডার প্রকাশিত তালিকায় নেট মিটারিং কর্মসূচির জন্য অনুমোদিত বিভিন্ন সোলার মডিউলের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের হিসাব ও অর্থ পরিশোধ। গ্রাহক যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা সেটির হিসাব সংরক্ষণ করবে। এরপর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সেই বিদ্যুতের মূল্য ও প্রণোদনার অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে। নগদ অর্থে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়নি। প্রতি তিন মাস অন্তর অর্থ পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে যাদের সোলার সিস্টেম ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালের পর স্থাপন হবে, তারা এই বিশেষ প্রণোদনার আওতায় পড়বেন না। অর্থাৎ প্রণোদনা পেতে আগ্রহী গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত সময়সীমাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সোলার প্যানেল কেনা বা স্থাপন শুরু করাই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেট মিটারিংয়ের আওতায় এসে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ শুরু করার শর্ত পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে নেট মিটারিং ব্যবস্থা অবশ্য নতুন নয়। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক নিজের স্থাপনায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ গ্রিডে দিতে পারেন। দ্বিমুখী মিটারের মাধ্যমে গ্রিডে পাঠানো বিদ্যুতের হিসাব রাখা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ বর্তমানে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় নেট মিটারিং নির্দেশিকা, বাস্তবায়ন গাইডলাইন এবং বিশেষ প্রণোদনা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট পেজে এসব নীতিমালা ও নির্দেশিকার তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে।
দেশে রুফটপ সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পেছনে জমির স্বল্পতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য আলাদা জমির প্রয়োজন হলেও শহর ও শিল্পাঞ্চলের অসংখ্য ভবনের ছাদ ইতোমধ্যে বিদ্যমান। এসব ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসও ভোক্তার কাছাকাছি রাখা সম্ভব হয়।
স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নেট মিটারিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির লক্ষ্যও দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
নতুন বিশেষ প্রণোদনার ফলে বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ভবনের মালিকদের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে একটি সিস্টেম স্থাপনের আগে সম্ভাব্য খরচ, ছাদের উপযোগিতা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন, যন্ত্রপাতির মান, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং নেট মিটারিংয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ গ্রিডে সরবরাহযোগ্য উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের পরিমাণ নির্ভর করবে সিস্টেমের উৎপাদনক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট ভবনের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর।
সরকারের পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে রুফটপ সোলারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে দেশের সীমিত ভূমি ব্যবহারের বাস্তবতা বিবেচনায়।
সব মিলিয়ে, ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ গ্রাহকদের জন্য একটি নতুন আর্থিক প্রণোদনা তৈরি করেছে। তবে এ সুবিধা পেতে হলে সময়সীমা, নেট মিটারিং, অনুমোদিত প্রযুক্তি ও কারিগরি মানদণ্ডসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে। ফলে যেসব গ্রাহক নিজেদের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও স্রেডার নিয়ম অনুসরণ করে গ্রিড সংযোগ নিশ্চিত করা।