প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিজয়-২৪ হলের একটি কক্ষ দখল করে সেখানে অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে হলের ২১৬ নম্বর কক্ষে ওঠার পর সেখানে থাকা তিন শিক্ষার্থী কক্ষটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে ওই কক্ষটি একাই ব্যবহার করছেন তিনি—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে হলে নিয়মিত থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান শুভ। তাঁর দাবি, তিনি হলে ওঠেননি এবং নিয়মিত সেখানে থাকেনও না। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের পাশের একটি ভবনে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে এবং প্রায় দুই বছর ধরে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। কেবল একদিন গভীর রাতে বাসার দারোয়ানকে না পাওয়ায় তিনি হলে অবস্থান করেছিলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। ফলে কক্ষটি দখলে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে একদিকে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত নেতার বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
জানা গেছে, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। চলতি বছরের ১৮ জুন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হলে তাঁকে আহ্বায়ক করা হয়। এর আগে তিনি একই শাখার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অভিযোগের সূত্রপাত বিজয়-২৪ হলের ২১৬ নম্বর কক্ষকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে ওই কক্ষে অবস্থান শুরু করেন শুভ। এর আগে কক্ষটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিয়ান আরিফ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আশরাফ মুন্না এবং মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত অবস্থান করতেন। তাঁদের মধ্যে রিফাতের জায়গায় কিছুদিন তাঁর ভাই, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুনতাসীর বিল্লাহও থাকতেন। আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ফ্লোরিং করে ওই কক্ষে অবস্থান করতেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শুভ ওই কক্ষে ওঠার পর আগের শিক্ষার্থীরা কক্ষটি ছেড়ে অন্য কক্ষে চলে যান। এরপর কক্ষটির পুরোটা তিনি একাই ব্যবহার করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রথম দিকে গভীর রাতে তাঁকে হলে প্রবেশ করতে দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে দিনের বেলাতেও তাঁর অবস্থান চোখে পড়েছে বলে কয়েকজনের ভাষ্য। এমনকি হল প্রশাসন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নজর এড়াতে কক্ষে অবস্থানের সময় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখা এবং বাইরে জুতা না রেখে সেগুলো কক্ষের ভেতরে রাখার মতো আচরণের কথাও অভিযোগে উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন মোস্তাফিজুর রহমান শুভ। তিনি জানিয়েছেন, বিজয়-২৪ হলের পাশের একটি ভবনে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে এবং গত দুই বছর ধরে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হলে নিয়মিত থাকার কোনো প্রশ্নই নেই। একদিন অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পর বাসার দারোয়ানকে খুঁজে না পাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে হলে রাত কাটিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে হলে থাকার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
হলের কক্ষটি দখলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদলের আরেক নেতা মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন রিফাত। তাঁর বক্তব্য, শুভ হলে ওঠেননি; বিভিন্ন কারণে তিনি দুই-তিন দিন সেখানে অবস্থান করেছিলেন। বিজয়-২৪ হলের দক্ষিণ পাশে একটি ভবনে শুভ থাকেন বলেও তিনি দাবি করেছেন।
এদিকে বিষয়টি হল প্রশাসনের নজরে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজয়-২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান খান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুভ হলে ওঠার বিষয়ে তাঁকে কোনো তথ্য দেননি। হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত খোঁজখবর রাখার সময় বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও উপউপাচার্যকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
হল প্রশাসনের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে কাদের থাকার অনুমতি রয়েছে, কক্ষ বরাদ্দের প্রক্রিয়া কী এবং শিক্ষার্থী হিসেবে অবস্থানের ক্ষেত্রে কী ধরনের শর্ত মানতে হয়—এসব বিষয় নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হওয়ার কথা। এ কারণে কোনো ব্যক্তির ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেলে তিনি হলের আবাসিক সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন কি না, সেটিও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার জানিয়েছেন, হলে অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী সেই নীতিমালা অনুসরণ না করলে হল প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগটি যাচাই করে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবুল বাশারও জানিয়েছেন, যাদের ছাত্রত্ব নেই, তারা নিয়ম মেনে হলে থাকার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। তবে শুভর হলে অবস্থানের বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হলে কে থাকেন বা কে উঠেছেন, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই চূড়ান্ত হবে।
ক্যাম্পাসের আবাসিক হল শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি কক্ষে একাধিক শিক্ষার্থীকে থাকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি হলের সীমিত আবাসন সুবিধা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধার অপেক্ষায় থাকেন, তাঁদের কাছে একটি কক্ষের ব্যবহার ও বরাদ্দের বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া কোনো ব্যক্তি হলে অবস্থান করছেন কি না, কিংবা কোনো কক্ষ নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—এ ধরনের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রশাসনিক তদন্ত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একদিকে হল প্রাধ্যক্ষ জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করেছেন; অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান শুভ হলে নিয়মিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর সহকর্মী মোতাসিম বিল্লাহ রিফাতও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে ২১৬ নম্বর কক্ষটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখানে কার অনুমতি রয়েছে, তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করলেই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে অভিযোগটি নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও দূর হতে পারে। একই সঙ্গে হলের কক্ষ বরাদ্দ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন নিয়ম কার্যকর আছে কি না, সে বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের কাছে পরিষ্কার হবে। বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অভিযোগকে ঘিরে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ২১৬ নম্বর কক্ষটি কোন নিয়মে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখানে অবস্থানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ অনুমতি রয়েছে কি না। প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি যাচাই ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই এর উত্তর পাওয়ার কথা।