প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার (এটিএফ) ২০২৬। দেশি-বিদেশি পর্যটনপ্রেমীদের কাছে বিভিন্ন গন্তব্য, ভ্রমণসেবা ও পর্যটনপণ্যের পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের পর্যটনশিল্পে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এ আয়োজন করা হয়েছে।
১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এবারের মেলা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে। তিনটি প্রদর্শনী হলে প্রায় ৩০০টি বুথে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সেবা, পণ্য ও গন্তব্যের তথ্য তুলে ধরবে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত আজ সকাল ১১টায় মেলার উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং পর্যটন খাতের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এবারের মেলায় শুধু ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য গন্তব্য বেছে নেওয়ার সুযোগই থাকছে না, পর্যটনশিল্পের ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্যও তৈরি করা হয়েছে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ। হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইনস, সরকারি-বেসরকারি পর্যটন সংস্থা, বিদেশি দূতাবাস ও বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেদের কার্যক্রম তুলে ধরবে। ফলে একই ছাদের নিচে ভ্রমণসেবা গ্রহণকারী, সেবা প্রদানকারী এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ‘ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ শোকেস’। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা দেশি ও বিদেশি দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, হাওর, সমুদ্রসৈকত, বনাঞ্চল, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকছে এখানে।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের বৈচিত্র্য তুলে ধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজধানী ও কয়েকটি পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। মেলায় এসব সম্ভাবনা তুলে ধরার মাধ্যমে নতুন গন্তব্য সম্পর্কে ভ্রমণকারীদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে বলে আয়োজকদের প্রত্যাশা।
এর পাশাপাশি থাকছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম শোকেস’। এখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো তাদের নিজ নিজ পর্যটন গন্তব্য, ভ্রমণসুবিধা, সংস্কৃতি ও পর্যটনসেবা তুলে ধরবে। ফলে বাংলাদেশের পর্যটকরা বিদেশি বিভিন্ন গন্তব্য সম্পর্কে সরাসরি তথ্য জানার সুযোগ পাবেন। একইভাবে বিদেশি অংশগ্রহণকারীরাও বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন।
এবারের আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম ইনভেস্টমেন্ট শোকেস’। পর্যটন অবকাঠামো, আবাসন, পরিবহন, বিনোদন এবং অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ফলে মেলার ব্যবসায়িক অংশটি পর্যটন খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মেলায় বিটুবি বা ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা বৈঠক, সেমিনার, বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যের উপস্থাপনা, প্যানেল আলোচনা, পণ্য ও সেবার প্রচার এবং নেটওয়ার্কিংয়ের আয়োজনও থাকছে। এসব আয়োজনে পর্যটন খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন। একই সঙ্গে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নতুন অংশীদার খোঁজা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন।
আয়োজকদের মতে, পর্যটনশিল্পকে শুধু অবকাশযাপন বা ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। পর্যটনকে কেন্দ্র করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেশন, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, বিনোদন এবং নানা ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হলে একটি পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে বহুমুখী কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টি সম্ভব।
এই বাস্তবতায় এবারের মেলায় কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন, পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্য তুলে ধরার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
মেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন থাকবে। ফলে পর্যটন গন্তব্যের তথ্য ও ব্যবসায়িক আলোচনার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। পর্যটন এবং সংস্কৃতির এই সংযোগ দর্শনার্থীদের কাছে একটি দেশের পরিচিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবারের মেলায় অংশ নেওয়া ১০টি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের পর্যটনপণ্য ও সেবা উপস্থাপন করবে। এর ফলে আঞ্চলিক পর্যটন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন যোগাযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটন খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক পর্যায়ে পর্যটন ব্যবসা ও যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা দেশের পর্যটন গন্তব্যকে বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে আরও পরিচিত করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান ও হাওর, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির মতো বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ রয়েছে দেশে। এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে প্রচার, যোগাযোগ ও সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদারত্বও প্রয়োজন।
পর্যটন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও মেলাটি নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এক জায়গায় বিভিন্ন দেশের পর্যটন গন্তব্য ও সেবা সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ফলে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের প্যাকেজ, সেবা ও পর্যটনপণ্য সম্পর্কে সরাসরি ধারণা দেওয়ার সুযোগ পাবে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, তিন দিনের এ মেলার মাধ্যমে পর্যটন খাতে নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হবে, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়বে এবং বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে এ ধরনের আয়োজন শুধু কয়েক দিনের মেলায় সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ও পর্যটন উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আজ থেকে শুরু হওয়া ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার তাই ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য যেমন নতুন গন্তব্য ও অভিজ্ঞতার দরজা খুলছে, তেমনি পর্যটন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও তৈরি করছে সম্ভাব্য নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র। তিন দিনের আয়োজন শেষে এসব যোগাযোগ ও উদ্যোগ বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, সেটিই হবে মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।