পোশাক খাতে সরকার-বিরোধী দলের সহযোগিতা চায় বিজিএমইএ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার
পোশাক খাতে সরকার-বিরোধী দলের সহযোগিতা চায় বিজিএমইএ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট, উৎপাদন ও রপ্তানি পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নেতারা। আলোচনায় শিল্পের স্বার্থে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা জানিয়েছেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হয়ে বৈঠকটি রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত চলে। বৈঠকে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, সংকট এবং সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান সমস্যাগুলো শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ও জড়িত। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রায় ৩ হাজার উদ্যোক্তা খাতটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

বিজিএমইএ নেতারা বৈঠকে পোশাক রপ্তানি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বর্তমান পর্যায় থেকে ভবিষ্যতে পোশাক রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের পথে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, অর্থায়নের উচ্চ ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং এলডিসি উত্তরণের পর নতুন বাণিজ্যিক বাস্তবতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আলোচনায় উঠে আসে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পোশাকশিল্পের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শফিকুর রহমান উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিরোধী দলের কাছ থেকেও সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শিল্পের জন্য একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়ের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রত্যাশা জানানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা থাকা দরকার।

অন্যদিকে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে। তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান অবস্থা, এর সমস্যা, সম্ভাবনা এবং এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন—এসব বিষয়ে ধারণা নেওয়াই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে জানান তিনি। )

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতের সমস্যা সমাধানে সরকার, বিরোধী দল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনস্বার্থে সরকারের কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হলে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তাতে সহযোগিতা করবে। আবার জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরোধিতাও করা হবে।

বৈঠকে জ্বালানি সংকট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতি শিল্প খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে—এমন বাস্তবতায় পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে জামায়াতে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকারকে জ্বালানি সংকটসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তিনি সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে সংসদের ভেতরে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জনগণের ন্যায্য দাবির বিষয়েও কথা বলার কথা জানান তিনি।

বৈঠকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিজিএমইএ নেতারা মনে করেন, উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ প্রয়োজন। পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁরা মত দেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনও বৈঠকের আলোচনায় আসে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কনীতি, বাণিজ্যিক পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এ পরিস্থিতিতে দেশের পোশাকশিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে নীতি সহায়তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সহজ অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বৈঠকের আলোচনাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিতে কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক থাকা মানে শুধু রপ্তানি আয় নয়, লাখো পরিবারের আয়-রোজগারও সচল থাকা। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাংকঋণের ব্যয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের মতো বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে শিল্পের সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এবং বিজিএমইএর একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষের বক্তব্যে তৈরি পোশাকশিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা, প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকটি ছিল মূলত শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময়ের একটি পর্ব, যেখানে উদ্যোক্তারা সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষের কাছ থেকেই সহযোগিতা প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবস্থান বিবেচনায় এই আলোচনার গুরুত্ব রয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার জ্বালানি ও অর্থায়ন পরিস্থিতির উন্নতি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হলে এ খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বৈঠকে উঠে আসা সহযোগিতা, স্থিতিশীলতা এবং সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়গুলো ভবিষ্যতে কীভাবে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, সেটিই পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত