তালা ঝুলছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, পরিদর্শনে ক্ষুব্ধ এমপি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
তালা ঝুলছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, পরিদর্শনে ক্ষুব্ধ এমপি

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান ফটকে তালা দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এস এম রফিকুল ইসলাম। বুধবার বেলা ১১টার দিকে গাজীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে তিনি প্রধান ফটক তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। পরে ফটকের পাশের কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এমন পরিস্থিতি দেখতে পাওয়ায় সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ঘটনাস্থল থেকেই তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে অনেক সময় উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যাওয়ার আগে এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্র খোলা না থাকা বা সেবা না পাওয়ার অভিযোগ স্থানীয় মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জানা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বুধবার আকস্মিকভাবে সেখানে যান সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম। কেন্দ্রের সামনে পৌঁছে তিনি প্রধান ফটকে তালা দেখতে পান। এ সময় কেন্দ্রের ভেতরে থাকা একজন কর্মী ফটকের কাছে এলে সংসদ সদস্য তাঁকে তালা খুলতে বলেন। ওই কর্মী তাঁর কাছে চাবি নেই বলে জানান।

এরপর সংসদ সদস্য ফটকের পাশের কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে গিয়ে তিনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মূল ভবনের কলাপসিবল ফটকেও তালা দেখতে পান। বিষয়টি দেখে তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং মুঠোফোনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।

পরবর্তীতে পেছনের ফটক দিয়ে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য। তাঁর পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি নিয়ে তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

ঘটনার ব্যাখ্যায় গাজীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক হাসান আল মামুন জানান, মূল ফটকের চাবি তাঁর কাছেই ছিল। তবে ভুলবশত তিনি চাবিটি সঙ্গে আনেননি। তাঁর কাছে কেন্দ্রের পেছনের গেটের চাবি ছিল এবং সেটি খুলে তিনি ভেতরে প্রবেশ করে একটি সভায় অংশ নিচ্ছিলেন। এ সময় সংসদ সদস্য এসে প্রধান ফটক তালাবদ্ধ দেখতে পান।

অন্যদিকে, শ্রীপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ বলেন, ওই কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে প্রতিদিন সেবা দেওয়া হয় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটিতে শনিবার সেবা দেওয়া হয়। সংসদ সদস্য যখন পরিদর্শনে যান, তখন কেন্দ্রের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা পাক্ষিক সভায় অংশ নিচ্ছিলেন। ফলে পরিদর্শনের সময় কেন্দ্রের কার্যক্রম সম্পর্কে বাইরে থেকে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

তবে সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক কিংবা মেডিক্যাল অফিসার উপস্থিত ছিলেন না। কয়েকজন কর্মচারী ভেতরে বসে গল্প-আড্ডায় সময় কাটাচ্ছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সংসদ সদস্য বলেন, গাজীপুর ইউনিয়ন একটি প্রত্যন্ত এলাকা। এখানকার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে যদি প্রয়োজনীয় জনবল বা সেবার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে স্থানীয় মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সপ্তাহের কোন দিন এবং কী সময় সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে, সে বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষ নির্দিষ্ট সেবার সময় না জানলে চিকিৎসা নিতে এসে কেন্দ্র বন্ধ পেতে পারেন। এতে তাঁদের সময় ও অর্থ দুটিই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এক পক্ষের বক্তব্যে বলা হয়েছে, চাবি ভুলবশত সঙ্গে না থাকায় প্রধান ফটক খোলা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্যে জানা যায়, কেন্দ্রটিতে শনিবার সেবা দেওয়া হয় এবং পরিদর্শনের সময় কর্মীরা পাক্ষিক সভায় ছিলেন। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্ধারিত সেবা কার্যক্রম, কর্মীদের উপস্থিতি এবং আকস্মিক পরিদর্শনের সময় দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো আরও পরিষ্কারভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো সরকারি সেবাকেন্দ্রে দরজায় তালা দেখা যাওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজন নিয়ে কোনো রোগী বা তাঁর স্বজন সেখানে গেলে সেবা না পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে ভোগান্তি বাড়তে পারে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেক সময় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার প্রথম সুযোগ। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে সেবা কার্যক্রমের সময়সূচি, কর্মীদের উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কার্যকর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য খাতের সেবার মান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু চিকিৎসক বা ওষুধের উপস্থিতিই নয়, প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কার্যক্রমও বিবেচনায় আসে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কখন খোলা থাকবে, কোন দিন কী সেবা পাওয়া যাবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোথায় থাকবেন এবং রোগীরা কীভাবে সেবা পাবেন—এসব তথ্য স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। এতে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি কমে এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা বাড়ে।

সংসদ সদস্যের আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে পর্যালোচনা করে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তালাবদ্ধ ফটকের বিষয়টি যেমন ব্যাখ্যার দাবি রাখে, তেমনি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মীদের উপস্থিতি ও নির্ধারিত সেবা কার্যক্রমও যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের প্রকৃত কারণ ও দায়িত্বে কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।

স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত সময়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন। চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন কোনো রোগীকে অযথা উপজেলা বা জেলা শহরে ছুটতে না হয়, সে জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর রাখা জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গাজীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ঘটনাটি তাই শুধু একটি ফটকে তালা থাকার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। সংসদ সদস্যের পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কার্যক্রম আরও নিয়মিত ও জনবান্ধব করতে কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত