প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুইডেনের সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের সঙ্গে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছে মধ্য-বামপন্থী বিরোধী জোট। ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও দুই পক্ষের ব্যবধান এতটাই কম যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আসনসংখ্যায় পরিবর্তন ঘটছে। সর্বশেষ হিসাবে বিরোধী জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সরকার গঠনের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
রোববার অনুষ্ঠিত সুইডেনের সংসদ নির্বাচনে ৩৪৯ আসনের রিক্সড্যাগে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ম্যাগদালেনা আন্দেরসন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসন। ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে এসে দুই জোটের আসনসংখ্যা বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। সুইডেনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এসভিটির সর্বশেষ হিসাবে ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর বিরোধী জোট ১৭৬টি এবং ক্ষমতাসীন জোট ১৭৩টি আসনে রয়েছে।
এর আগে ভোট গণনার বিভিন্ন পর্যায়ে দুই জোটের ব্যবধান কখনো তিন আসন, কখনো এক আসনে নেমে এসেছিল। একপর্যায়ে ১৭৫-১৭৪ আসনের ব্যবধানও দেখা যায়। ফলে এবারের নির্বাচন যে কতটা কাছাকাছি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, তা ফল গণনার ওঠানামাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসভিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৭ হাজার ভোটের ব্যবধান নিয়ে দুই জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল এবং কিছু ভোটকেন্দ্রের গণনা তখনো বাকি ছিল।
সুইডেনের এবারের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কারণে নয়, দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতাসীন জোটে রয়েছে মডারেটস, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস, লিবারেলস এবং সুইডেন ডেমোক্র্যাটস। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের মূল সমীকরণে রয়েছে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস, গ্রিন পার্টি, লেফট পার্টি ও সেন্টার পার্টি। নির্বাচনের ফলাফল যদি বর্তমান প্রবণতার মতোই থাকে, তাহলে নতুন সরকার গঠনে বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা ও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ম্যাগদালেনা আন্দেরসনের নেতৃত্বাধীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় একক দল হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। সর্বশেষ গণনায় দলটি ৯৯টি আসনে রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মডারেটস পেয়েছে ৭০টি আসন এবং সুইডেন ডেমোক্র্যাটস রয়েছে ৬২টি আসনে। বিরোধী জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে লেফট পার্টি ৩০, গ্রিন পার্টি ২২ এবং সেন্টার পার্টি ২৫টি আসনে রয়েছে বলে এসভিটির ফলাফলে দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি হলো সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের ভূমিকা। দলটি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অভিবাসন, অপরাধ ও সামাজিক নীতির বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর দলটি সরকারকে সমর্থন করলেও সরাসরি মন্ত্রিসভার অংশ হয়নি। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে তাদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী জোটের সম্ভাব্য সরকার গঠনও সহজ হবে না। কারণ জোটের দলগুলোর মধ্যে অভিবাসন, করনীতি, জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনের আগে এসব নীতিগত প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থানের পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে আসনসংখ্যায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
সুইডেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া যথেষ্ট নয়। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নির্বাচিত রিক্সড্যাগের প্রথম অধিবেশন, স্পিকার নির্বাচন এবং এরপর প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নের প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে পর্যাপ্ত সমর্থন বা অন্তত প্রয়োজনীয় বিরোধিতার অনুপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। ফলে ভোট গণনায় কোনো একটি জোট সামান্য এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের আলোচনা আলাদা একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে সামনে আসে।
এদিকে বিদেশ থেকে আসা ভোট এবং দেরিতে পৌঁছানো ব্যালট এখনো গণনার অংশ হিসেবে রয়েছে। বড় শহরগুলোর কিছু দেরিতে আসা ভোটও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সুইডিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে প্রাথমিক বা প্রায়-চূড়ান্ত হিসাব এবং আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফলাফলের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকার সুযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সুইডেনের ভোটারদের দেওয়া রায় এখনো পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি। তবে নির্বাচনের ফলাফলে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো দেশটির রাজনীতিতে দুই বড় জোটের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত সংকুচিত হয়েছে। ভোটের শেষ হিসাব, আসন বণ্টন এবং পরবর্তী জোট আলোচনা—এই তিনটি বিষয়ই এখন সুইডেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরই পরিষ্কার হবে কোন দল বা জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ নেবে। বিরোধী জোটের সামান্য ব্যবধানের নেতৃত্ব যদি বহাল থাকে, তাহলে ম্যাগদালেনা আন্দেরসনের সামনে নতুন সরকার গঠনের জন্য মিত্র দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বড় দায়িত্ব আসতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনের নেতৃত্বাধীন জোটও শেষ পর্যন্ত কতটি আসন ধরে রাখতে পারে এবং সংসদে তাদের অবস্থান কী দাঁড়ায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে সুইডেনের এবারের নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা সামনে এনেছে। মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানও কীভাবে সংসদের আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আনতে পারে, ভোট গণনার শেষ পর্যায়ের ওঠানামা তারই উদাহরণ। এখন দৃষ্টি চূড়ান্ত গণনা এবং পরবর্তী সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকে।