যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কে বাড়ছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ বার
যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কে বাড়ছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা এবং বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এর প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্ক নতুন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা এমন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করতে চায়, যা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্স ও কানাডাসহ আরও কয়েকটি দেশও একই ধরনের পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বর্তমান ধারা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পদক্ষেপের লক্ষ্য ইসরায়েলের সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্য বন্ধ করা নয়; বরং অধিকৃত ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করা। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গবেষণা বিভাগও জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী পণ্য ও সেবার ওপর বিধিনিষেধ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং বসতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। লন্ডনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি ব্রিটিশ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইসরায়েল অবশ্য এসব পদক্ষেপকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সা’আর যুক্তরাজ্যের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও নিষেধাজ্ঞাকে সমাধানের পথ হিসেবে না দেখে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার ঘোষণা দেয় ইসরায়েল। কনস্যুলেটটি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কূটনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছিল। ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কনস্যুলেট বন্ধের প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা একটি সমন্বয়কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ কনস্যুলেটের গুরুত্ব শুধু প্রতীকী নয়। পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীরসংক্রান্ত বিভিন্ন কূটনৈতিক ও কনস্যুলার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ব্রিটিশ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই মিশনের ভূমিকা ছিল। ফলে কনস্যুলেট বন্ধের সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের বাস্তব ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

গাজা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে। গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও মানবিক সহায়তা সমন্বয়ের জন্য গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল। ইসরায়েলের পাল্টা সিদ্ধান্তের ফলে সেই সহযোগিতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে পশ্চিম তীরের পাশাপাশি গাজা ইস্যুতেও লন্ডন ও তেল আবিবের নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এই বিরোধের পেছনে দীর্ঘদিনের একটি আন্তর্জাতিক বিতর্কও রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলে আসে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে ইসরায়েলি বসতি গড়ে ওঠে। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বহু দেশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি পরামর্শমূলক মতামতেও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাজ্য ওই মতামতের সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

বসতি সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে ‘ই-১’ প্রকল্প। পূর্ব জেরুজালেমের কাছাকাছি পশ্চিম তীরে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যোগাযোগ আরও জটিল হয়ে পড়তে পারে বলে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ মনে করে। ব্রিটিশ সরকার এ প্রকল্পকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য গুরুতর বাধা হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ওই এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বানের পর লন্ডনের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তবে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্নও রয়েছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ বহু দশকের প্রক্রিয়া। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় বাণিজ্যের যে অংশ পড়বে, তা ইসরায়েলের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় সীমিত। ফলে অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি এসব পদক্ষেপের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্যই বড় হয়ে উঠেছে।

এদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকেও পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা ও বসতি নীতিতে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য দেশের একই ধরনের পদক্ষেপ সরাসরি ইসরায়েলি সরকারের নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ব্রিটিশ সরকার এসব পদক্ষেপকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল এটিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে যায়নি। বরং নির্দিষ্টভাবে বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে দুই দেশের পূর্ণাঙ্গ সম্পর্কচ্ছেদের চেয়ে নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক সংঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আগামী দিনে এই বিরোধ কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ইসরায়েলি-প্যালেস্টিনি সংঘাত এবং গাজা পরিস্থিতির ওপর। যুক্তরাজ্য যদি আরও নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের পথে এগোয়, তাহলে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াও আরও কঠোর হতে পারে। আবার কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন কোনো ভারসাম্যে ফিরতে পারে। আপাতত পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপই দেখাচ্ছে, পশ্চিম তীরের বসতি প্রশ্নটি শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার বিরোধ নয়; এটি ইসরায়েল ও তার দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্রদের সম্পর্কের ওপরও ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত