প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন আটকে থাকা আমানত ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে একযোগে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। বরং আমানত ফেরতের জন্য আবেদন করা গ্রাহকদের বড় একটি অংশ এখনো তাঁদের অর্থ উত্তোলন করেননি। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে আমানত জমা পড়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে একদিকে পুরোনো আমানত ফেরতের চাপ থাকলেও অন্যদিকে নতুন অর্থ প্রবেশ করায় ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এক লাখ ২৪ হাজার ৮৭৭ জন গ্রাহক মোট পাঁচ হাজার ৫১১ কোটি টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ৯০৭ জন গ্রাহক এক হাজার ৪৩১ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। অর্থাৎ আমানত ফেরতের আবেদন করা গ্রাহকদের প্রায় ৭১ শতাংশ এখনো তাঁদের অর্থ তুলে নেননি।
এই পরিসংখ্যান ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা গ্রাহকদের জন্য টাকা তোলার সুযোগ তৈরি হওয়ার পর শুরুতে ব্যাপক উত্তোলনের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আবেদনকারীদের বড় অংশ টাকা হাতে পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ তুলে নিচ্ছেন না। এতে ব্যাংকের ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়নি।
আমানত ফেরতের সুযোগ চালুর প্রথম দিকে অবশ্য গ্রাহকদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি ছিল। ১ সেপ্টেম্বর ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক এক হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। তাঁদের মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর আট হাজার ১২৫ জন মোট ৩১৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। পরদিন ২ সেপ্টেম্বরের আবেদনের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক টাকা ফেরত নেওয়ার আবেদন করেন। ওই দিন ১৯ হাজার ৬১৩ জন গ্রাহক এক হাজার ১৬ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮ সেপ্টেম্বর সাত হাজার ২৩৪ জন ৩৪০ কোটি টাকা তুলে নেন।
পরবর্তী দিনগুলোতে উত্তোলনের পরিমাণ যথাক্রমে ৩৮১ কোটি ও ৩৯১ কোটি টাকার পর্যায়ে ছিল। তবে আবেদনকারীর তুলনায় প্রকৃত অর্থ উত্তোলনকারীর সংখ্যা কম থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর প্রত্যাশিত মাত্রায় চাপ তৈরি হয়নি।
এদিকে শুধু আমানত উত্তোলনের হিসাব নয়, ব্যাংকটিতে নতুন করে অর্থ জমা পড়ার প্রবণতাও আলোচনায় এসেছে। ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দিনে ব্যাংকটিতে নতুন করে ৮৯৪ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ১৪১ কোটি টাকা, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫ কোটি টাকা, ৯ সেপ্টেম্বর ২৪৪ কোটি টাকা এবং ১০ সেপ্টেম্বর ৩১৪ কোটি টাকা নতুন আমানত হিসেবে এসেছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক গ্রাহক আমানত ফেরতের আবেদন করলেও পরে অর্থ উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন। শাখা থেকে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে টাকা না নেওয়ার বিষয়টি জানান। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসার একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
ব্যাংকটির লেনদেন ব্যবস্থাতেও স্বাভাবিকতার চিত্র ফেরার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নগদ লেনদেনের পাশাপাশি আরটিজিএস, বিএফটিএন এবং ক্লিয়ারিং কার্যক্রম চালু হয়েছে। ফলে গ্রাহকদের দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও আগের তুলনায় বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের বক্তব্যেও আমানতকারীদের আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে আমানত উত্তোলনের চাপ তুলনামূলক কম থাকায় ব্যাংকটির পুনর্গঠন ও ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর চাপও কিছুটা কমেছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পেছনে রয়েছে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বড় একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়েছে। একীভূত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটিকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে।
এর আগে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে ‘হেয়ারকাট’ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এরপর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের আমানত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তবে বর্তমানে টাকা উত্তোলনের চাপ কম থাকলেও এটিকে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কয়েক দিনের বা স্বল্প সময়ের উত্তোলন পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের জনবল, শাখা ও পরিচালন কাঠামো নতুন ব্যাংকের জন্য বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ১৬ হাজার কর্মী, ৭৫৯টি শাখা এবং প্রায় ৭০০টি উপশাখার কার্যক্রম নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জনবলের পুনর্বিন্যাস এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে খেলাপি ঋণ। গত জুনের শেষে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নতুন ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
ফলে শুধু আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে থাকা একমাত্র দায়িত্ব নয়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি কমানো এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের একটি বড় অংশ আবেদন করার পরও টাকা না তোলায় ব্যাংকটির জন্য কিছুটা সময় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন আমানত আসার প্রবণতাও সেই পরিস্থিতিকে কিছুটা সহায়তা করছে। তবে এই স্বস্তি ধরে রাখতে হলে গ্রাহকদের আস্থা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
একসময় অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তায় থাকা গ্রাহকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের আমানত প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম কতটা স্থায়ীভাবে ফিরছে। সেই দিক থেকে বর্তমান তথ্য কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও ব্যাংকটির সামনে থাকা বড় আর্থিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের ওপরই ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।