প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাঠে তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের স্বপ্নের শুরু। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ঘরের দল। ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্যালারিতে তখন স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসের আবহ। কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে সেই আবহ বদলে যায় হতাশা ও ক্ষোভে। ব্রাইটনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে কারাবাও কাপের তৃতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে মাইকেল ক্যারিকের দলকে।
এই হার শুধু একটি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নয়, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জন্য ফিরিয়ে এনেছে প্রায় পাঁচ দশক আগের একটি তেতো স্মৃতি। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম বিভাগ লিগে টটেনহামের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে হেরেছিল ইউনাইটেড। এরপর ঘরের মাঠে কোনো ম্যাচে দুই গোলে এগিয়ে গিয়ে হারের ঘটনা আর দেখা যায়নি। দীর্ঘ ৫০ বছর পর ব্রাইটনের বিপক্ষে একই ব্যবধানে একইভাবে ম্যাচ হারল ক্লাবটি।
সময়ের ব্যবধান অর্ধশতাব্দী। ফুটবল বদলে গেছে, ক্লাবের প্রজন্ম বদলেছে, ওল্ড ট্রাফোর্ডের অসংখ্য স্মৃতি যোগ হয়েছে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু বুধবার রাতের হার যেন পুরোনো এক ক্ষতকে নতুন করে সামনে নিয়ে এল। এমনকি ইউনাইটেডের বর্তমান সময়ের অনেক বয়স্ক সমর্থকের কাছেও ১৯৭৬ সালের সেই ম্যাচের স্মৃতি এতদিন ছিল কেবল ইতিহাসের অংশ। এবার ব্রাইটনের বিপক্ষে একই ধরনের পরাজয় সেই ইতিহাসকে আবারও আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে।
১৯৭৬ সালের সেই ম্যাচের সময় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভবিষ্যৎ সোনালি যুগের অন্যতম প্রধান কারিগর স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনও তখন ওল্ড ট্রাফোর্ডে ছিলেন না। তিনি তখন সেন্ট মিরেনের কোচ হিসেবে কাজ করছিলেন। ইউনাইটেডের পরবর্তী প্রজন্মের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দেরও তখন মাঠে আসার বয়স হয়নি। অথচ পাঁচ দশক পর সেই পুরোনো পরাজয়ের ছায়া বর্তমান দলের ওপর এসে পড়ল।
ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুটা ছিল ইউনাইটেডের পক্ষে। দ্রুত দুই গোল করে দলটি মনে হচ্ছিল নিয়ন্ত্রণেই রেখেছে ম্যাচ। কিন্তু প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে একটি গোল হজম করার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাইটন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ৬৫ ও ৬৯ মিনিটে আরও দুটি গোল করে তারা ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দেয়।
শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ইউনাইটেডকে। আর এই পরাজয়ের ফলে কারাবাও কাপের পরবর্তী রাউন্ডে ওঠার সুযোগও শেষ হয়ে যায়।
ম্যাচের পর ইউনাইটেড সমর্থকদের হতাশা ছিল স্পষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, ব্রাইটনের বিপক্ষে এই হার সেটিকে আরও তীব্র করেছে। শেষ বাঁশি বাজার পর গ্যালারি থেকে দুয়োধ্বনি শোনা যায়। খেলোয়াড়েরা মাঠ প্রদক্ষিণ করার সময় অনেক সমর্থক এরই মধ্যে স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যারা থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকেও দলকে সমর্থনের বদলে ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায়।
এর আগে ম্যানচেস্টার ডার্বিতে হারের হতাশাও ইউনাইটেড সমর্থকদের মনে ছিল। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই ঘরের মাঠে ব্রাইটনের কাছে এমন নাটকীয় পরাজয় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
পরাজয়ের পর দলের পারফরম্যান্সের দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন কোচ মাইকেল ক্যারিক। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে দলের পারফরম্যান্সের জন্য নিজেকেই দায়ী করেছেন তিনি। ক্যারিকের বক্তব্যে ম্যাচের শেষ দিকে দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ক্যারিকের জন্য চলতি মৌসুমের শুরুটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি ইউনাইটেডকে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেন। সেই সাফল্যের পর তাঁকে স্থায়ী কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি করা হয়। কিন্তু নতুন মৌসুমে তাঁর দল আবারও অনিশ্চিত পারফরম্যান্সের মুখে পড়েছে।
চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ছয়টি ম্যাচ খেলেছে ইউনাইটেড। এর মধ্যে তিনটিতেই হার। প্রিমিয়ার লিগের চার ম্যাচে জয় এসেছে মাত্র একটিতে, দুটি ম্যাচে হার এবং একটি ম্যাচে ড্র। সব মিলিয়ে চার ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের ১৩তম অবস্থানে রয়েছে দলটি। এর সঙ্গে কারাবাও কাপ থেকে বিদায় যোগ হওয়ায় মৌসুমের শুরুতেই ক্যারিকের ওপর চাপ বাড়ছে।
একাদশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তও আলোচনায় এসেছে। ব্রাইটনের বিপক্ষে মূল একাদশে আটটি পরিবর্তন করেছিলেন ক্যারিক। ম্যাচের ফলের পর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অনেকের মতে, একসঙ্গে এত পরিবর্তনের ফলে দলের সমন্বয় ও স্কোয়াডের গভীরতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। তবে ক্যারিকের অবস্থান হলো, বর্তমান পরিস্থিতি সুখকর না হলেও দল ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে।
তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর কাছে ভালো লাগছে না। কিন্তু একই সঙ্গে দল আবার জয়ের ধারায় ফিরতে পারবে এবং নিজেদের পারফরম্যান্সে উন্নতি করতে পারবে—এমন আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন।
ক্যারিক নিজেও ইউনাইটেডের সোনালি সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। ফলে ক্লাবটির হয়ে খেলার সময় সমর্থকদের প্রত্যাশা ও চাপ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোচ হিসেবে সেই চাপের মুখোমুখি হলেও তিনি জানিয়েছেন, বাইরের চাপকে নিজের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে দিতে চান না। তাঁর কাছে মূল বিষয় হলো ম্যাচ জেতা, দলের পরিবেশ ভালো রাখা এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার বিশ্বাস তৈরি করা।
তবে মাঠের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত কোচের অবস্থান ও দলের পরিস্থিতি মূল্যায়নের সবচেয়ে দৃশ্যমান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। সেই জায়গায় চলতি মৌসুমে ইউনাইটেড এখনো প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে ঘরের মাঠে দুই গোলে এগিয়ে থেকেও ব্রাইটনের কাছে পরাজয় দলের দুর্বলতার কয়েকটি দিককে সামনে এনেছে।
ম্যাচের শুরুতে আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে সুবিধা তৈরি করার পর সেটি ধরে রাখতে না পারা, দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষকে জায়গা দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল হজম করা—সব মিলিয়ে ইউনাইটেডের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্কোয়াডে পর্যাপ্ত বিকল্পের সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
অবশ্য একটি ম্যাচের ফল দিয়ে পুরো মৌসুমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। সামনে প্রিমিয়ার লিগে আরও ম্যাচ রয়েছে এবং দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও থাকবে। কিন্তু কারাবাও কাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় অন্তত একটি প্রতিযোগিতা থেকে ইতিমধ্যে ছিটকে গেছে ইউনাইটেড। লিগে চার ম্যাচ শেষে চার পয়েন্ট নিয়ে ১৩তম অবস্থানও সমর্থকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ব্রাইটনের বিপক্ষে হারটি শুধু পরাজয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ৫০ বছর পর ওল্ড ট্রাফোর্ডে দুই গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে হারের পুরোনো রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি হিসেবে এটি ইউনাইটেডের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
একসময় যে ক্লাবের ঘরের মাঠ প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ের জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই ওল্ড ট্রাফোর্ডেই এখন ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ক্যারিকের সামনে তাই শুধু পরবর্তী ম্যাচ জেতার চ্যালেঞ্জ নয়, দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং সমর্থকদের সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সের দূরত্ব কমানোর কাজও রয়েছে।
৫০ বছর আগের সেই স্মৃতি হয়তো এতদিন কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় ছিল। ব্রাইটনের কাছে ৩-২ গোলে হারার পর সেটিই এখন আবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বর্তমান বাস্তবতার আলোচনায় উঠে এসেছে। সামনে ক্যারিক ও তাঁর দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই রাতের হতাশাকে কীভাবে পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণায় পরিণত করা যায়।