প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ ভারতের তামিল সিনেমার সীমানা পেরিয়ে এবার হলিউডে যাওয়ার পথে বিজয় সেতুপতি অভিনীত আলোচিত সিনেমা ‘মহারাজা’। ২০২৪ সালে মুক্তির পর ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগানো ক্রাইম থ্রিলারটি এবার হলিউডে নতুনভাবে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিনেমাটির প্রযোজক সুধন সুন্দরম প্রকল্পটির বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। তবে হলিউড সংস্করণে কারা অভিনয় করবেন, কে পরিচালনা করবেন এবং মূল গল্পে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে—এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
‘মহারাজা’ মুক্তির পর শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে চীনের বাজারে সিনেমাটির সাফল্য নির্মাতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সেই সাফল্যের পর হলিউডের একটি শীর্ষস্থানীয় এজেন্সি সিনেমাটির রিমেক স্বত্ব নিয়ে নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে জানিয়েছেন সুধন সুন্দরম।
প্রযোজকের বক্তব্য অনুযায়ী, হলিউডের একজন প্রথম সারির অভিনেতাকে কেন্দ্র করে সিনেমাটির নতুন সংস্করণ তৈরির চেষ্টা চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালে শুটিং শুরু হতে পারে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে সম্ভাব্য অভিনয়শিল্পী, পরিচালক কিংবা মুক্তির তারিখ নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
হলিউড সংস্করণে বিজয় সেতুপতির অভিনীত চরিত্রটি কে করবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্কারজয়ী অভিনেতা ম্যাথু ম্যাককনাহির নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে ম্যাককনাহি সিনেমাটিতে অভিনয় করছেন—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর নামকে আপাতত সম্ভাব্যতা ও অনলাইন আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে।
সুধন সুন্দরম জানিয়েছেন, প্রকল্পের আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির পক্ষ থেকেই অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং শুটিংয়ের অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে। অর্থাৎ বর্তমানে সিনেমাটির হলিউড রিমেক নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ এগোলেও অভিনয়শিল্পী নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মহারাজা’ পরিচালনা করেন নিতিলান স্বামীনাথন। সিনেমাটিতে বিজয় সেতুপতিকে দেখা যায় একজন নাপিতের চরিত্রে। সাধারণ জীবনযাপন করা এই চরিত্রকে ঘিরেই গল্প ধীরে ধীরে একটি জটিল ও আবেগঘন পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যায়। সিনেমার গল্প বলার ধরন, চিত্রনাট্যের বিন্যাস এবং বিভিন্ন ঘটনার রহস্য উন্মোচনের পদ্ধতি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
বিজয় সেতুপতির অভিনয়ও সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। সাধারণ একজন মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের মধ্যে আবেগ, অসহায়ত্ব এবং প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষার যে সমন্বয় দেখা যায়, তা দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। তাঁর মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন সঞ্চনা নামিদাস। অন্যদিকে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ খল চরিত্রে ছিলেন অনুরাগ কাশ্যপ।
‘মহারাজা’র বিশেষত্ব শুধু এর গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। সিনেমার চিত্রনাট্য এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, যেখানে দর্শককে শুরু থেকেই পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা না দিয়ে ধীরে ধীরে বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। ফলে সিনেমার এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর অর্থও নতুনভাবে সামনে আসে। এই ধরনের গল্প বলার কৌশল সিনেমাটিকে আলোচনায় রাখে।
ভারতের বাইরে চীনের বাজারেও ‘মহারাজা’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চীনে সিনেমাটির বক্স অফিস আয় ৯১ কোটি ৬৫ লাখ রুপির বেশি হয়েছে। বিদেশের একটি বড় বাজারে তামিল ভাষার সিনেমাটির এই সাফল্য নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় সম্ভাবনার কথা ভাবতে উৎসাহিত করে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সিনেমাটির সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তরুণ অভিনয়শিল্পীদের কাজ। সঞ্চনা নামিদাসের অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে। ২০২৬ সালে ‘মহারাজা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার তথ্যও সিনেমাটির সাফল্যের সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এখন মূল সিনেমার গল্প হলিউডের দর্শকদের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। একটি দেশের সামাজিক বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত গল্প অন্য দেশের দর্শকদের জন্য পুনর্নির্মাণ করতে গেলে চরিত্র, পরিবেশ, ভাষা ও গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে মূল সিনেমার আবেগ ও নাটকীয়তা কতটা ধরে রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হলিউডে ভারতীয় সিনেমার রিমেক অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় সিনেমার গল্প বা ধারণা নিয়ে পশ্চিমা চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ায় এ ধরনের আগ্রহ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ‘মহারাজা’র ক্ষেত্রেও চীনের বাজারে সাফল্য এবং সিনেমাটির গল্পের আন্তর্জাতিকভাবে পুনর্নির্মাণযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলিউডের আগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজয় সেতুপতির জায়গায় যদি সত্যিই কোনো বড় হলিউড তারকা অভিনয় করেন, তাহলে নতুন সংস্করণটি নিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে। তবে বর্তমানে ম্যাথু ম্যাককনাহির নামটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছে। তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
একইভাবে ২০২৭ সালে শুটিং শুরুর সম্ভাবনার কথাও প্রযোজকের বক্তব্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য, অর্থায়ন, অভিনয়শিল্পী নির্বাচন, পরিচালক চূড়ান্ত করা এবং প্রযোজনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হয়। ফলে পরিকল্পিত সময়সূচিতে পরিবর্তনও আসতে পারে।
তবু ‘মহারাজা’র হলিউড রিমেকের খবর তামিল চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একটি আঞ্চলিক ভাষার সিনেমা প্রথমে নিজ দেশের দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, পরে আন্তর্জাতিক বাজারে সাড়া ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত তার গল্পকে অন্য চলচ্চিত্রশিল্পে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া—এই ধারাটি সিনেমাটির গ্রহণযোগ্যতার একটি আলাদা দিক তুলে ধরে।
এখন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। হলিউড সংস্করণে বিজয় সেতুপতির চরিত্রে কে অভিনয় করবেন, ম্যাথু ম্যাককনাহি সত্যিই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন কি না, পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাচ্ছে এবং মূল গল্প কতটা অপরিবর্তিত থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে পরবর্তী ঘোষণাগুলোতে।
‘মহারাজা’র সাফল্য ইতোমধ্যে তামিল সিনেমার জন্য একটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করেছে। এবার সেই গল্প যদি হলিউডের নির্মাণশৈলী ও অভিনয়শিল্পীদের মাধ্যমে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে, তাহলে সিনেমাটির যাত্রা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই নতুন সংস্করণ কতটা সফলভাবে মূল সিনেমার আবেগ, রহস্য ও গল্পের শক্তি ধরে রাখতে পারে, তার উত্তর জানতে দর্শকদের অপেক্ষা করতে হবে সিনেমাটির আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি ও পরবর্তী ঘোষণার জন্য।