প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। বুধবার স্থানীয় সময় প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হওয়া ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ কারণে রাশিয়ার অন্যতম বড় জ্বালানি ক্রেতা ভারত নতুন করে মার্কিন বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে বিল পাস হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভারতের পণ্যের ওপর ইতোমধ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে গেছে। বিলটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতা দেওয়ার পথ তৈরি করেছে। ট্রাম্প বিলে স্বাক্ষর করলে আইনটি কার্যকর হবে এবং এরপর নির্ধারিত শর্তের আওতায় প্রেসিডেন্ট চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। ফলে ভারতের জন্য এখনই কার্যকর ১০০ শতাংশ শুল্ক নয়, বরং সম্ভাব্য বড় ধরনের শুল্কঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া এই আইনের মূল লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ানো। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মস্কোর বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হলেও দেশটি এখনও বিভিন্ন দেশের কাছে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বিক্রি করছে। ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, এসব জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে। নতুন আইন সেই বাণিজ্যিক প্রবাহে আরও চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
বিলটির আওতায় রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ও এতে রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নয়; বরং রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি উদ্যোগ।
প্রতিনিধি পরিষদের ভোটের ফলও বিলটির রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেছে। মোট ২৬২ জন প্রতিনিধি বিলটির পক্ষে ভোট দেন এবং ১৫৯ জন বিপক্ষে ভোট দেন। পক্ষে ভোট দেওয়া সদস্যদের মধ্যে ২০৩ জন রিপাবলিকান, ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট এবং একজন স্বতন্ত্র প্রতিনিধি ছিলেন। বিপক্ষে ভোট দেন সাতজন রিপাবলিকান ও ১৫২ জন ডেমোক্র্যাট। অর্থাৎ দলীয় বিভাজন থাকলেও দুই দলের প্রতিনিধিদের একটি অংশ বিলটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এর আগে আগস্টে মার্কিন সিনেটেও বিলটি ব্যাপক সমর্থনে পাস হয়েছিল। সিনেটে ভোটের ফল ছিল ৮৬-১১। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদনের পর বিলটি এখন প্রেসিডেন্টের ডেস্কে পৌঁছেছে। ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে এবং তখন নতুন নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য শুল্ক ব্যবস্থার প্রয়োগের জন্য প্রশাসনের হাতে আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশটির রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ তেলের দাম তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হওয়ায় ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে, এই ধরনের ক্রয় রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করছে। অন্যদিকে ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার পরিস্থিতি ও জনগণের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে।
এর ফলে নতুন মার্কিন আইনটি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। ভারতীয় তৈরি পোশাক, ওষুধ, প্রকৌশল পণ্য, যন্ত্রপাতি, রত্ন ও গহনা এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য মার্কিন বাজারে যায়। এসব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ও ব্যাপক শুল্ক আরোপ করা হলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে। তবে বাস্তবে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসন আদৌ শুল্ক আরোপ করে কি না, করলে কোন পণ্য ও কোন হারে শুল্ক আরোপ করা হয় এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী বাণিজ্য আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত আসে তার ওপর।
বিলটির আগের পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি সংশোধনীও উত্থাপিত হয়েছিল, যাতে ভারতসহ ১০টি দেশের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার প্রস্তাব ছিল। ওই তালিকায় ভারত ও চীনের পাশাপাশি তুরস্ক, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের নাম ছিল। তবে সংশোধনীর প্রস্তাব এবং শেষ পর্যন্ত আইনে কীভাবে বিধানটি কার্যকর হবে—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না। মূল বিষয় হলো, আইনটি প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ব্যবহারের ক্ষমতা দিচ্ছে।
এদিকে বিলটির সমর্থকেরা মনে করছেন, রাশিয়ার জ্বালানি ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হলে মস্কোর জ্বালানি আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন সীমিত করার ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বিলটির বিরোধিতাকারী মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ প্রেসিডেন্টের হাতে এত বিস্তৃত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, নির্বাহী শাখার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গেও নতুন বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
ভারতের জন্য পরিস্থিতিটি তাই একই সঙ্গে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কূটনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির কারণে ভারতের জন্য সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত সুবিধা রয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকারও দেশটির রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন মার্কিন আইন কার্যকর হওয়ার পর ওয়াশিংটন কীভাবে এর শুল্ক বিধান ব্যবহার করে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়া ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার ঘটনা নয়। বরং এটি এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করছে, যার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এখন ট্রাম্পের স্বাক্ষর এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে ভারত কীভাবে তার জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি বাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।