ব্রিকসের পর শি-রামাফোসার অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার
ব্রিকসের পর শি-রামাফোসার অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন শেষ হওয়ার পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে দুই নেতার পরিস্থিতি এক নয়। রামাফোসার অসুস্থতার বিষয়টি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। অন্যদিকে শি জিনপিং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সম্মেলনের সময় জ্ঞান হারিয়েছিলেন—এমন একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও এর স্বাধীন বা সরকারি কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্রিকস সম্মেলনের পর বিশ্বনেতাদের অসুস্থ হয়ে পড়ার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবিকে ভুয়া সতর্কতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর নেতারা অংশ নেন। সম্মেলনে শি জিনপিংও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং ব্রিকস সহযোগিতা, বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন। চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বর তিনি সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দেন এবং ১৩ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় অধিবেশনেও বক্তব্য রাখেন।

এর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়ে। চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শিয়ে দাবি করেন, ব্রিকস সম্মেলনের সময় শি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী, দিল্লিতে প্রাথমিক চিকিৎসার পর বিশেষ বিমানে শিকে চীনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে সামরিক হেলিকপ্টারে করে বেইজিংয়ের একটি সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে এসব দাবির কোনোটি চীন সরকার নিশ্চিত করেনি। এমনকি শি জিনপিংয়ের স্ট্রোক বা অস্ত্রোপচারের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে এ মুহূর্তে তার স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিকে নিশ্চিত খবর হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।

বরং ব্রিকস সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের কার্যক্রমের সরকারি নথি থেকে দেখা যায়, তিনি সম্মেলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন। ১৩ সেপ্টেম্বর চীনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ও সরকারের প্রকাশিত তথ্যে তার দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি ব্রিকস সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ার একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার অসুস্থতার বিষয়টি সামনে আসে। তবে রামাফোসার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক বেশি স্পষ্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ১৬ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে জানায়, অসুস্থতার কারণে রামাফোসাকে সাময়িকভাবে জনসম্মুখের কর্মসূচি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার চিকিৎসক দল তাকে বিশ্রাম ও সুস্থ হয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছে।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয় আরও জানিয়েছে, রামাফোসা ব্রিকস সম্মেলন শেষে সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরেছেন। এরপর তার চিকিৎসক দলের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। নির্ধারিত যেসব কর্মসূচিতে তার উপস্থিত থাকার কথা ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্যরা তার প্রতিনিধিত্ব করবেন।

তবে রামাফোসার অসুস্থতার ধরন বা গুরুতরতা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে তার অসুস্থতার কারণ নিয়ে অনুমানভিত্তিক তথ্য ছড়ানোর সুযোগ নেই। সরকারি বিবৃতিতে কেবল বলা হয়েছে, তিনি অসুস্থ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে বিশ্রামে রয়েছেন।

ব্রিকস সম্মেলনে রামাফোসার অংশগ্রহণও ছিল সক্রিয়। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য দেন এবং ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যবসায়িক আলোচনায় অংশ নেন। ১৩ সেপ্টেম্বরও তিনি ব্রিকসের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি নথিতে তার এসব কার্যক্রমের তথ্য রয়েছে।

ফলে সম্মেলন শেষ হওয়ার পর রামাফোসার অসুস্থতার খবর প্রকাশিত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে অপ্রমাণিত দাবিও ছড়িয়ে পড়ায় দুটি ঘটনা একসঙ্গে আলোচনায় আসে। তবে এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্টচেক ইউনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক দাবিকে ‘ফেক অ্যালার্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে। বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতারা সম্মেলনের পর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন—এমন দাবির বিষয়ে মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকতে বলেছে।

এই পরিস্থিতিতে শি জিনপিংয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়া তথ্য এবং রামাফোসার অসুস্থতার সরকারি ঘোষণাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। শির ক্ষেত্রে যে তথ্যটি আলোচনায় এসেছে, সেটি মূলত একজন চীনা ভিন্নমতাবলম্বীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি। অন্যদিকে রামাফোসার ক্ষেত্রে তার নিজের কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে অসুস্থতার বিষয়টি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পর কোনো নেতার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানা জল্পনা যুক্ত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অসম্পূর্ণ বা যাচাইহীন তথ্য সেই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনায় সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ব্রিকস সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্বও এ ঘটনাকে আরও আলোচিত করেছে। ২০২৬ সালের সম্মেলনে শি জিনপিং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। চীন ব্রিকসের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন প্রস্তাবও সামনে এনেছে। একই সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও সম্মেলনের ফাঁকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকাও ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সংগঠনটির কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রামাফোসা সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, বহুপক্ষীয়তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন। ফলে সম্মেলন শেষ হওয়ার পর তার সাময়িক জনসম্মুখ কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রামাফোসার অসুস্থতা সরকারি সূত্রে নিশ্চিত হলেও তার অসুস্থতার বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করা হয়নি। আর শি জিনপিংয়ের স্ট্রোক ও অস্ত্রোপচারের দাবি এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে দুই নেতার স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে একই মাত্রায় সত্য বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ব্রিকস সম্মেলনের পর তৈরি হওয়া এই আলোচনা তাই মূলত দুটি ভিন্ন ধরনের তথ্যের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে—একদিকে সরকারি ঘোষণায় নিশ্চিত হওয়া একটি অসুস্থতার খবর, অন্যদিকে যাচাইহীন একটি গুরুতর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার বা প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশিত হলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

বর্তমানে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা চিকিৎসকদের পরামর্শে বিশ্রামে রয়েছেন এবং তার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে মন্ত্রিসভার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। আর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার দাবির কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। তাই শির স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়া দাবিকে আপাতত অপ্রমাণিত দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত