অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের পরিবার আনার নিয়মে কড়াকড়ি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীদের পরিবার আনার নিয়মে কড়াকড়ি

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবার নিয়ে বসবাসের সুযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। দেশটির সরকার নতুন অভিবাসন নীতির আওতায় বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর স্টুডেন্ট ভিসার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যুক্ত করার সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভিসা পরিবর্তনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো, তথাকথিত ‘ভিসা হপিং’ এবং ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আনা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক বক্তব্যে এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসন ব্যবস্থায় আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর চাপ সামাল দেওয়া এবং অস্থায়ী ভিসার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় দেশটিতে অবস্থানের প্রবণতা কমানোই এসব পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য। সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সাধারণভাবে তাদের স্টুডেন্ট ভিসার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার আগের সুযোগ আর পাবেন না। তবে নিয়মটি সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে না। অস্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের পরিবার আলাদা করে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের নাগরিক এবং নির্দিষ্ট কিছু উচ্চতর শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও নির্দিষ্ট শর্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের বক্তব্য অনুযায়ী, পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জীবনযাপন ও শিক্ষাগত অবস্থান স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় আলাদা। সে কারণে উচ্চতর গবেষণামূলক শিক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরিবার নিয়ে দেশটিতে বসবাস করেন। ফলে নতুন সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু শিক্ষাজীবনের নয়, পারিবারিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যারা সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ভিসা পরিকল্পনা নতুন নিয়ম অনুযায়ী সাজাতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভিসা পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়েও কঠোর হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। সরকার ‘ভিসা হপিং’ নামে পরিচিত এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী একটি কোর্স শেষ করার পর একই বা অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের আরেকটি কোর্সে ভর্তি হয়ে নতুন ভিসা বা অবস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। সরকারের নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উচ্চতর পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করে মাস্টার্সে গেলে সেটি উচ্চতর শিক্ষাগত পর্যায়ে অগ্রসর হওয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু একই বা নিম্নতর পর্যায়ের একাধিক কোর্সে ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার পথ তৈরি করার সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হবে। সরকারি নীতিতে শিক্ষার্থী ভিসাকে মূলত প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওয়ার্কিং হলিডে মেকার বা ব্যাকপ্যাকারদের ভিসা। এ ভিসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বয়সসীমার তরুণরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে কাজ ও ভ্রমণের সুযোগ পান। আঞ্চলিক এলাকায় নির্দিষ্ট সময় কাজ করার শর্ত পূরণ করলে তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর থাকার সুযোগও ছিল।

নতুন নিয়মে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর থাকার ক্ষেত্রে ব্যালট ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বছরের জন্য সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার জায়গা রাখা হবে। এর আগে গত বছর প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ দ্বিতীয় বছরের জন্য যোগ্য হয়েছিল। তৃতীয় বছরের জন্য সুযোগ আরও সীমিত করে ৫ হাজার করা হচ্ছে। গত বছর এই পর্যায়ে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ যোগ্য হয়েছিল। দ্বিতীয় বছরের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক এলাকায় ৮৮ দিনের কাজ এবং তৃতীয় বছরের ক্ষেত্রে ছয় মাস কাজ করার শর্ত বহাল থাকবে।

তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে ব্রিটিশ ওয়ার্কিং হলিডে ভিসাধারীদের জন্য এসব পরিবর্তনের কিছু অংশ প্রযোজ্য হবে না।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার একই সঙ্গে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাদের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ব্যবস্থা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় বৈধ ভিসা না থাকা ব্যক্তিদের দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা ও আটক রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এমন অভিবাসন এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা অযোগ্য বা ভিত্তিহীন আবেদন করতে উৎসাহিত করেন।

পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব ভিজিটর ভিসায় সাধারণভাবে ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে সরকার। এর ফলে কেউ পর্যটক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করে দেশটির ভেতর থেকেই অন্য ধরনের ভিসায় যাওয়ার পথ সীমিত হবে। সরকারি ব্যাখ্যায়, ভিজিটর ভিসাকে প্রকৃতপক্ষে ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে এই পরিবর্তনের পেছনে আবাসন সংকটও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটির জনসংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের নতুন হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটির জনসংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৭৯ লাখে পৌঁছেছে। ওই সময়ে নিট বিদেশি অভিবাসনের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন, ভাড়া, অবকাঠামো ও বিভিন্ন জনসেবার ওপর চাপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বিতর্কও বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিবাসন একাই আবাসন সংকটের কারণ নয়; তবে অভিবাসনের গতি এমন পর্যায়ে রাখতে হবে যাতে আবাসন সরবরাহ ও অন্যান্য অবকাঠামো জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী মহলের মধ্যে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হলে অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করার সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা দেশটির শিক্ষা খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে ভিসা নীতির পরিবর্তনের প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য।

তবে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও অভিবাসন বন্ধ করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং কোন ধরনের অভিবাসন দেশের প্রয়োজন, কারা দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারবেন এবং অস্থায়ী ভিসাগুলো কীভাবে ব্যবহার হবে—এসব বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোই সংস্কারের লক্ষ্য। সরকারি নীতিতে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নতুন নিয়মগুলো ধাপে ধাপে আগামী ১২ মাসে কার্যকর করার কথা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, কাজ কিংবা পরিবার নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসার ধরন, শিক্ষার স্তর, কোর্স পরিবর্তন এবং পরিবারের সদস্যদের আবেদনের যোগ্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে আগ্রহীদের নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভিসার সর্বশেষ শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন হবে।

অস্ট্রেলিয়ার এই পরিবর্তন দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সরকার অভিবাসনের সংখ্যা ও অস্থায়ী ভিসার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরজা খোলা রাখার কথাও বলছে। ফলে নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী, পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শ্রমবাজার—সব পক্ষের ওপরই এর প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত