সিলেট বিএনপিতে প্রকাশ্যে অভ্যন্তরীণ দূরত্ব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
সিলেট বিএনপির নীরব ‘দ্বন্দ্ব’ এখন প্রকাশ্যে

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট নগরকেন্দ্রিক বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ও দূরত্বের আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এক পক্ষের কর্মসূচিতে অন্য পক্ষের অনুপস্থিতি, অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়া বা না পাওয়া এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজনের আলোচনা জোরালো হয়েছে।

সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফরকে ঘিরে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির অনেক নেতার অনুপস্থিতি সেই আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে। ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেট নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি অংশ নিলেও মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন না। পরে মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আয়োজকদের কথিত স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তাঁরা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি।

তবে একই দিনে রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোসহ অন্যান্য আয়োজনে মহানগর বিএনপির নেতাদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। ফলে পুরো রাষ্ট্রীয় সফর বর্জন না করে নির্দিষ্ট একটি নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার ঘটনাই রাজনৈতিকভাবে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, নাগরিক সংবর্ধনাটি কোনো দলীয় অনুষ্ঠান ছিল না। সিটি প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাটির পেছনে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়র পদে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে একাধিক নেতা সক্রিয় রয়েছেন। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে বিএনপির সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নেতাদের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে তিনি আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা বা না করার বিষয়টি শুনেছেন; বিষয়টি সিটি নির্বাচনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন।

সিলেটের বিএনপির রাজনীতিতে বিভিন্ন নেতাকে কেন্দ্র করে একাধিক বলয় সক্রিয় থাকার কথাও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচিত। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাবশালী কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে ঘিরে অনুসারীদের আলাদা আলাদা অবস্থান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু সমীকরণও তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে এসব রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সমীকরণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিটি নির্বাচন সামনে আসায় এই প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা। দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন, তা এখনো নির্ধারিত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে নেতাকর্মীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে এসব সম্ভাব্য প্রার্থীর নিজস্ব সাংগঠনিক যোগাযোগ ও অনুসারী থাকায় তাঁদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন বলয়ের উপস্থিতিও আলোচনায় আসছে।

মেয়র পদে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আলোচনায় সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামানের নাম এসেছে। তবে এসব নামের কাউকেই দলীয়ভাবে মেয়র প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরও কিছু ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি তর্কে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি তখন দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। একইভাবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে নাছিম হোসেইনকে ঘিরে উত্তেজনার ঘটনাও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচিত হয়।

এদিকে গত ১ সেপ্টেম্বর মহানগর বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধনের অনুষ্ঠান নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দলের জেলা পর্যায়ের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে। স্থানীয় নেতাদের একটি অংশের ধারণা, সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক দূরত্বের প্রভাব বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও পড়তে শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর রাজনৈতিক অবস্থানও সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট বিএনপির আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে তিনি বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান। এর পর থেকেই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়।

নাগরিক সংবর্ধনায় মহানগর বিএনপির অনুপস্থিতির বিষয়ে রেজাউল হাসান কয়েস লোদীও তাঁর অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন অনেক নেতা-কর্মী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাননি। এ কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অস্বস্তি বোধ করেছেন। অন্যদিকে সিটি প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেছেন, অনুষ্ঠানটি দলীয় আয়োজন না হওয়ায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

১৫ সেপ্টেম্বরের ওই নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অংশ নেন। সিলেট সফরের অংশ হিসেবে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং পরে নগর ভবনে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন। অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, পেশাজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির ওই সফর ছিল তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর সিলেটে প্রথম সফর। নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি সিলেটের পর্যটন, চা, মৎস্য ও শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। ফলে একদিকে রাষ্ট্রপতির সফর ও নাগরিক সংবর্ধনাকে ঘিরে সিলেটে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে নেতাদের অনুপস্থিতি ও পারস্পরিক দূরত্বের বিষয়টি আলাদা করে আলোচনায় আসে।

সিলেট মহানগর বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং আসন্ন সিটি নির্বাচন। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। দলীয় মনোনয়ন বা নির্বাচনী প্রার্থী নির্ধারণের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে বর্তমান সমীকরণগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছেন, নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সাংগঠনিক কর্মসূচিতে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কারণ একাধিক বলয়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়লে তার প্রভাব তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক নাগরিক সংবর্ধনার ঘটনা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি সিলেট মহানগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সিটি রাজনীতির সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে কোন পক্ষের অবস্থান ভবিষ্যতে কতটা প্রভাব ফেলবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় রাজনীতির চিত্র কীভাবে বদলাবে, তা নির্ভর করবে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও আসন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত