প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ ও ঝটিকা মিছিলের চেষ্টার কয়েকটি ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকটি ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে সন্দেহভাজনদের। পুলিশের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কিছু নেতার নির্দেশনায় এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, পুলিশ স্থাপনা, গণপরিবহন এবং জনসমাগমের কাছাকাছি স্থানে বিস্ফোরণের খবর সামনে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর গুলশান-১ এলাকায় ঝটিকা মিছিলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনার সময় ককটেল ও বোমা নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাবার বুলেট ছোড়ে এবং ঘটনাস্থল থেকে অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারের কথা জানায়।
এর কয়েক দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে রায়হান উদ্দিন নামে আওয়ামী লীগের একটি ইউনিটের দপ্তর সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ডিবি। আদালত চার আসামিকে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
ডিবির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
১৯ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী মোড় ও কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। একই রাতে কাফরুল থানার সামনে একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরদিন পল্লবীর সিরামিক রোডে একটি বাসে অগ্নিসংযোগ এবং হাইকোর্টের সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণের খবর আসে। শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছে বলে জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর এই ধারাবাহিকতার কথা একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
এর আগে রাজধানীর মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, বাবুবাজার, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা ও নিউ মার্কেট এলাকাতেও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ীতে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় ইবাদুর রহমান নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাগুলোর ধরন ও স্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে।
রাজধানীর বাইরে ফরিদপুর ও গাইবান্ধাতেও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফরিদপুর সদরের করিমপুর হাইওয়ে থানার সামনে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে রাখা একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর বাসটি পুলিশের হেফাজতে ছিল বলে জানা গেছে। আগুনে বাসটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতারা ঘটনাটির জন্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করলেও অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে কারা এতে জড়িত ছিল।
২০ সেপ্টেম্বর ভোরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের গোপালচরণ এলাকায় তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিস্ফোরণের সময় রাজনৈতিক স্লোগান শোনার দাবি করেছেন। তবে এ ধরনের প্রত্যক্ষদর্শী বক্তব্যও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনার সময়কাল ও পারস্পরিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যেও এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাশকতার মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছেন। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারাও সাম্প্রতিক অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনায় আওয়ামী লীগের ভূমিকার অভিযোগ তুলে আইনগত ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলেছেন। এসব বক্তব্য অবশ্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গাতেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক তৎপরতা সীমিত হয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন নাশকতার মাধ্যমে উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। আবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন, তারা বলছেন, এ ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল এবং নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তার প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই হবে পরবর্তী ধাপ। যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক উত্তেজনা যেমন বেড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাস, রেলস্টেশন, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার আশপাশে বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; যাত্রী, চালক, পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারাও ঝুঁকিতে পড়েন।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধ ও মতপার্থক্য শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক উপায়ে প্রকাশের পাশাপাশি নাশকতার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার সঙ্গে কারা প্রকৃতভাবে জড়িত, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে বের করে আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের আওতায়। সামনে তদন্তে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে আইনগত পদক্ষেপ, তদন্তের ফল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরবর্তী অবস্থানের ওপর।