রাশিয়ার নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে পুতিনের দল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
রাশিয়ার নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে পুতিনের দল

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমা নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক ভোট গণনায় দলটি প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত আংশিক ফলাফলে ইউনাইটেড রাশিয়ার এই অগ্রগতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে ভোট গণনা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসনসংখ্যা ও চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চূড়ান্ত ফল ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

তিন দিন ধরে চলা এই নির্বাচন রবিবার শেষ হয়। এবারের ভোট রাশিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম স্টেট ডুমা নির্বাচন। ৪৫০ সদস্যের এই পার্লামেন্টের অর্ধেক আসনে দলীয় তালিকার ভিত্তিতে এবং বাকি অর্ধেক আসনে একক আসনের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেওয়া হয়। প্রাথমিক ফলাফলে দলীয় তালিকার ভোটে ইউনাইটেড রাশিয়ার স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইউনাইটেড রাশিয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং নিউ পিপলসও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে। প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে কয়েকটি দল স্টেট ডুমায় প্রবেশের প্রয়োজনীয় ভোটসীমা অতিক্রম করার পথে রয়েছে। তবে ভোট গণনা অব্যাহত থাকায় দলগুলোর চূড়ান্ত ভোটের হার এবং ৪৫০টি আসনের বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে।

২০২১ সালের নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া ৪৫০টি আসনের মধ্যে ৩২৪টি আসনে জয় পেয়েছিল। সেই নির্বাচনে দলটি দলীয় তালিকার ভোটে ৪৯ দশমিক ৮২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবারের প্রাথমিক ফলাফলে দলটির ভোটের হার আগের নির্বাচনের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে বর্তমান ফলকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই, কারণ এখনও সব ভোট গণনা শেষ হয়নি।

এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। প্রেসিডেন্ট পুতিন ভোটকে তার সরকারের নীতি এবং ইউক্রেনে চলমান সামরিক অভিযানের প্রতি জনসমর্থনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভোটের আগে তিনি রুশ নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং দেশ, ইতিহাস ও অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি মানুষের সংযোগের কথা উল্লেখ করেন। রুশ সরকারের দৃষ্টিতে নির্বাচনের ফল যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।

তবে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রেমলিনের নীতির কার্যকর বিরোধিতা করার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবারের নির্বাচনে সীমিত ছিল। যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ইয়াবলোকো দলের কেন্দ্রীয় দলীয় তালিকা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত করা হয়। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে ইউনাইটেড রাশিয়ার এগিয়ে থাকার পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণের পরিসর নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রাশিয়ার বাইরে থাকা নাগরিকেরাও ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত রুশ নাগরিকদের জন্য ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বিদেশে ভোট দেওয়া কিছু রুশ নাগরিক এই অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক মত প্রকাশের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধিতার পরিসর সীমিত থাকার অভিযোগের কারণে নির্বাচনটি কতটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল, তা নিয়ে বিরোধী গোষ্ঠী ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে।

নির্বাচনের শেষ দিন রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ও আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। রুশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক ড্রোন মস্কো ও আশপাশের অঞ্চলের দিকে পাঠানো হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং একটি তেল স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাশিয়ার কর্মকর্তারা এসব হামলাকে নির্বাচন ব্যাহত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। ইউক্রেনীয় পক্ষ অবশ্য রুশ কর্মকর্তাদের সব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।

নির্বাচন চলাকালে রাশিয়ার নির্বাচনী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলার অভিযোগও সামনে আসে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এলা পামফিলোভা জানিয়েছিলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস বা ডিডস হামলার ঢেউ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব হামলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা হয়নি। একই সময়ে ভোটগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা চালু রাখার চেষ্টা করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ।

ভোটার উপস্থিতিও এবারের নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে তিন দিনের ভোট শেষে দেশজুড়ে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এই হার ২০২১ সালের স্টেট ডুমা নির্বাচনের তুলনায় বেশি। ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পড়েছে বলে সরকারি তথ্য থেকে জানা গেছে।

নির্বাচনের ফলাফল রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রাথমিকভাবে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা পুতিনের সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ, নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পরিবেশ এবং ভোটার উপস্থিতি নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোও নির্বাচনের সামগ্রিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ৪৫০টি আসনের মধ্যে কোন দল কতটি আসন পাচ্ছে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে ইউনাইটেড রাশিয়া আগের মতো পার্লামেন্টে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে কি না, তা রুশ আইন প্রণয়ন ও সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। তবে সেই চিত্র স্পষ্ট হতে ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে পাওয়া তথ্যকে তাই প্রাথমিক ফল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

রাশিয়ার এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে স্টেট ডুমার নতুন মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান শুধু আইন প্রণয়নের বিষয়েই নয়, যুদ্ধনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে সেই প্রভাবের বাস্তব চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত