রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের খুচরা বা রিটেইল ব্যাংকিং এবং কার্ড ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখা ব্যাংকটির এই ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের দুটি বড় বেসরকারি ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা ও বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং অধিগ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও শেষ হয়নি।

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। এরপর দেশের কয়েকটি ব্যাংক তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার বিভিন্ন অংশ অধিগ্রহণের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংককে বর্তমানে সম্ভাব্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হচ্ছে। উভয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পৃথক বৈঠকও হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই সিদ্ধান্তকে শুধু বাংলাদেশের বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই ব্যাংকটি বিভিন্ন দেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম কমিয়ে করপোরেট, ইনস্টিটিউশনাল ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের মতো ব্যবসায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গাম্বিয়া, জর্ডান, লেবানন, সিয়েরা লিওন ও জিম্বাবুয়ের মতো কয়েকটি বাজারে স্থানীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিছু দেশে কনজ্যুমার, প্রাইভেট ও বিজনেস ব্যাংকিং থেকে সরে গেলেও করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং চালু রেখেছে তারা।

বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার পরিসরও বেশ বড়। সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে ব্যাংকটির আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ব্যাংকটির রয়েছে ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ঋণ, গৃহঋণ, বিভিন্ন ধরনের আমানত এবং প্রিমিয়াম ও রিওয়ার্ডভিত্তিক কার্ড সেবার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যের গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসার একটি বিশেষ দিক হলো এর গ্রাহকভিত্তি। ব্যাংকটির অনেক গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকিং সম্পর্ক বজায় রেখে আসছেন। বিশেষ করে বেতন হিসাব, সঞ্চয়, ঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং অন্যান্য আর্থিক সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যাংকটির বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্যবসাটি অন্য কোনো ব্যাংকের হাতে গেলে শুধু আমানত ও ঋণের হিসাবই নয়, একটি প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকভিত্তিও নতুন ব্যাংকের আওতায় আসতে পারে।

তবে সম্ভাব্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রাহক ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ কোনো একটি ব্যাংকের রিটেইল পোর্টফোলিও অধিগ্রহণ করলেই সব গ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্যাংকের সঙ্গে একইভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। গ্রাহকদের নিজস্ব ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত এবং পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে অধিগ্রহণকারী ব্যাংকের জন্য ব্যবসার আর্থিক মূল্যায়নের পাশাপাশি গ্রাহক সম্পর্ক ধরে রাখার সক্ষমতাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সিটি ব্যাংকের জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের সম্ভাবনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বর্তমানে সিটি ব্যাংকের ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত ও ভোক্তা ঋণ ব্যবসা বড় পরিসরে রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ব্যবসা যুক্ত হলে ব্যক্তিগত ও ভোক্তা ব্যাংকিংয়ের আকার আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায় সিটি ব্যাংকের আগে থেকেই অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে কার্ড ব্যবসায় তারা একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।

সিটি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করতে পারে—এমন তথ্য পাওয়ার পর থেকেই তারা আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অধিগ্রহণের আগে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন, মূল্য নির্ধারণ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। ফলে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি পর্যায়ে বড় আমানত এবং ভোক্তা ঋণ ব্যবসার কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল পোর্টফোলিও তাদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলে ব্যাংকটির খুচরা ব্যাংকিং পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে। ব্র্যাক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মূল্য নির্ধারণসহ অধিগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ শেষ করতে হবে এবং পুরো বিষয়টি একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে।

সম্ভাব্য এই লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ একটি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং পোর্টফোলিও অন্য ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গ্রাহক, আমানত, ঋণ, কার্ড, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি অধিগ্রহণের মূল্য, সম্পদের গুণগত মান, ঋণের ঝুঁকি এবং গ্রাহক সম্পর্কের মূল্যায়নও প্রয়োজন হবে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পক্ষ থেকে অবশ্য রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে সরাসরি কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ব্যাংকটির করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাজারসংক্রান্ত গুঞ্জন বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে তারা মন্তব্য করেন না। তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে তাদের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং যেখানে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সম্পদ কেন্দ্রীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

বাংলাদেশের বাজারে নিজেদের দীর্ঘ উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘদিনের শিকড় ও শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে এবং দেশের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রয়েছে। ফলে রিটেইল ব্যবসা নিয়ে বর্তমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোন কাঠামোয় রূপ নেয়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এর আগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল এইচএসবিসি। তারও আগে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক। ফলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সম্ভাব্য রিটেইল ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

এখন মূল নজর থাকবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কী ধরনের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে কোন কোন ব্যাংক এতে অংশ নেয়। চূড়ান্ত মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং গ্রাহক ও কর্মীদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং খাতে এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত