প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক বয়কট করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, বর্তমান কাঠামোর অধীনে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ চলমান সাংবিধানিক সংকটের সমাধান করবে না; বরং সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী মনছারের ঘাট এলাকায় আয়োজিত কৃষক সমাবেশ ও গণশুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আখতার হোসেন এসব কথা বলেন। একই অনুষ্ঠানে কৃষকদের ভোগান্তি, সার সংকট এবং কৃষি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
আখতার হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধান নিয়ে যে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা শুধু সংসদীয় একটি কমিটির বৈঠক করে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত একটি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যেখানে জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে।
এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, দলটি শুরু থেকেই সরকারকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। তার ভাষ্য, সরকার সেই পথে না গিয়ে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আখতার হোসেনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সংশোধনী আনার মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করলে মূল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। এ কারণেই এনসিপি বিশেষ কমিটির বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের যে রায় এসেছে, সেটিকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে হবে। তার বক্তব্যে ‘জুলাই সনদ’-এর প্রসঙ্গও উঠে আসে। আখতার হোসেনের দাবি, ওই সনদে সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরও বড় সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণের জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা তা গ্রহণ করেনি। দলটির অবস্থান হলো, সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি পৃথক পরিষদ গঠন করে সেখানে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত। এরপর জনগণের দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তারা অবস্থান করছে।
অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার অবস্থান জানিয়েছে। ফলে সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য তৈরির বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কারের মধ্যে পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের নির্দিষ্ট ধারা পরিবর্তন বা সংযোজনের মাধ্যমে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। অন্যদিকে সংস্কারের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত পরিবর্তনের কথা বলছে। এনসিপির বক্তব্যে এই দ্বিতীয় অবস্থানটিই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
আখতার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধানের বর্তমান কাঠামোর যেসব বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, সেগুলোর মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধু কিছু ধারা সংশোধন করলেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। তার দল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার পক্ষে।
এদিকে, জলঢাকার কৃষক সমাবেশে সংবিধান ইস্যুর পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যার কথাও উঠে আসে। কৃষকেরা সার পাওয়া, কৃষি উপকরণের সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষি খাতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। গণশুনানিতে অংশ নেওয়া কৃষকদের বক্তব্যে তাদের দৈনন্দিন ভোগান্তি ও কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো সামনে আসে।
কৃষকদের এসব সমস্যার কথা রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে আখতার হোসেন বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য নীতিগত পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মত দেন।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে এনসিপির এই অবস্থান এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা এবং জুলাই-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন দলের অবস্থান এক নয়। কেউ বিদ্যমান সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আবার কেউ সংবিধান সংস্কারের জন্য পৃথক প্রক্রিয়ার কথা বলছে।
এনসিপি বলছে, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে নতুন বিরোধের জন্ম দিতে পারে। দলটির দাবি, জনগণের মতামত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটির কার্যক্রমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ অবস্থায় বিশেষ কমিটির বৈঠকে এনসিপির অনুপস্থিতি সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের একটি দৃশ্যমান দিক হয়ে উঠেছে। তবে এই মতপার্থক্য শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে কতটা কমানো সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে এনসিপি সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যকে ভিত্তি করে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির পথেই সমাধান খোঁজা উচিত।
সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কে এখন সামনে রয়েছে দুটি বিষয়—কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সেই পরিবর্তন কোন প্রক্রিয়ায় আনা হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার জন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনসিপির বৈঠক বয়কটের সিদ্ধান্ত সেই রাজনৈতিক বিতর্ককেই আরও স্পষ্ট করেছে। এখন বিশেষ কমিটির কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কতটা অংশ নেয় এবং সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য কীভাবে মোকাবিলা করা হয়—তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।