প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে দেশের প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে এই স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় চার কোটি মানুষ সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন।
দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কর্মজীবনে নিয়মিত আয় করলেও অবসর বা বার্ধক্যের সময়ে নির্ভরযোগ্য আর্থিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যান। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় অবদানভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তার একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়সে পৌঁছানোর পর যাতে একজন মানুষ সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়েন, সে লক্ষ্যেই অবদানভিত্তিক এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় সরকার প্রত্যেক নাগরিককে বিনামূল্যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও অবদানমূলক পেনশন তহবিল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কর্মজীবনে একজন ব্যক্তি নিয়মিত অর্থ জমা রাখবেন এবং নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর পর সেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগের আয় থেকে পেনশন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চারটি স্কিমে মোট গ্রাহকের সংখ্যা তিন লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৫। এসব গ্রাহকের জমা করা তহবিলের পরিমাণ ২৯১ কোটি ১৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
পেনশন তহবিলের নিরাপত্তা নিয়েও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্যারান্টিযুক্ত এবং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় বহনের কারণে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা গ্রাহকের হিসাবে জমা হওয়ার কথা। একই সঙ্গে মাসিক চাঁদার বিপরীতে কর রেয়াত এবং পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে আয়করমুক্ত সুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে পেনশন তহবিলের মুনাফার হার নির্দিষ্টভাবে সব সময় একই থাকবে—এমন নয়। প্রসপেকটাসে ৮ শতাংশ হারে লভ্যাংশের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রকৃত মুনাফা বিনিয়োগ থেকে অর্জিত প্রফিট মার্জিনের ওপর নির্ভর করে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক মানুষের নিয়মিত আয় থাকলেও সর্বজনীন পেনশন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে শুধু আর্থিক সক্ষমতা নয়, সচেতনতার ঘাটতিও অংশগ্রহণ বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রচার, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে এই স্কিমে অংশগ্রহণও বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য চালু করা প্রবাস স্কিম নিয়েও কাজ চলছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সহজে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
প্রবাসীদের অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলা কিউআর কোড চালুর কথাও জানানো হয়েছে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকেরা যাতে তুলনামূলক সহজে দেশে থাকা পেনশন হিসাবে অর্থ পাঠাতে পারেন, সে ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ চলছে।
তবে পেনশন স্কিমে অর্থ জমা দেওয়ার পর জরুরি প্রয়োজনে সেই টাকা তোলার সুযোগ নিয়ে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ উত্তোলনের বিধান নেই। বিশেষ পরিস্থিতিতে চাঁদাদাতাদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ন্যূনতম পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শর্তে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে কিছু সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নমিনির বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে সব স্কিমে শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। প্রয়োজনীয় অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ এবং বিধিমালা প্রণয়নের পর শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন হলে বর্তমানের তুলনায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার পরিসর ব্যাপকভাবে বাড়বে। বর্তমানে যেখানে কয়েক লাখ মানুষ এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন, সেখানে চার কোটি মানুষের অংশগ্রহণের লক্ষ্য একটি বড় সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষের আস্থা তৈরি, নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার সক্ষমতা, সহজ অর্থ জমার ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কাছে পেনশন ব্যবস্থার সুফল সহজ ভাষায় তুলে ধরা এবং অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ পেনশন মূলত তাৎক্ষণিক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন কর্মজীবী মানুষ আজ অল্প অল্প করে অর্থ জমা রাখলেও তার সুফল পাওয়া যাবে বহু বছর পর। ফলে এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা ও ধৈর্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের মতে, সর্বজনীন পেনশন বাস্তবায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি। নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে অনেক মানুষ এখনো এর সুবিধা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা, নিয়মিত প্রচার এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি মানুষকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে বড় পরিসরে পরিবর্তনের লক্ষ্য তুলে ধরে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বিষয় হবে শুধু গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষের কর্মজীবনের সঞ্চয় যাতে বার্ধক্যে সম্মানজনক জীবনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এখন এই ব্যবস্থার বিস্তারের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।