প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
এবি পার্টির নেতারা বলছেন, একসঙ্গে সব ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা করে বাড়ানোর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব ধাপে ধাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। এতে সীমিত আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর ব্যয়ের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের অস্থিরতা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। সরকারের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা হয়েছে।
সরকারের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও আমদানি ব্যয়ের চাপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে দেশীয় বাজারে বিদ্যমান দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয়ের ব্যবধান সামাল দিতে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে এবি পার্টির নেতাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পুরো প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে জ্বালানি খাতে অপচয়, অদক্ষতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, মূল্য নির্ধারণের আগে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কতটা পড়তে পারে, তা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন খাতে। ডিজেল দেশের সড়ক পরিবহন, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই ব্যয় ভাড়া বা পণ্য পরিবহন খরচের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও স্থানান্তরিত হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের সাম্প্রতিক মন্তব্যেও পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা উঠে এসেছে।
কৃষি খাতেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচের পাম্প, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক কৃষি কার্যক্রমে জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষকের খরচ যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বাজারে কৃষিপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মৌসুমি কৃষিপণ্য দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পরিবহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
শিল্প খাতেও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পণ্য উৎপাদন, কারখানার পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানি ব্যয় যুক্ত থাকে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে। এর প্রভাব পণ্যের মূল্য, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট মহলও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন ব্যবহারকারীদের ওপর পড়বে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা পেট্রোল ও অকটেননির্ভর অন্যান্য যানবাহন পরিচালনায় মাসিক ব্যয় বাড়তে পারে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এর প্রভাব দেখা দিতে পারে, কারণ জ্বালানি ব্যয় শুধু যানবাহনের মালিকের ব্যয়ের অংশ নয়; এটি মানুষের চলাচল ও বিভিন্ন সেবা সরবরাহের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এবি পার্টির নেতারা বিবৃতিতে বিশেষভাবে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কমাতে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন নীতি প্রয়োজন, যাতে একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ মোকাবিলা করা যায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।
তারা আরও বলেছেন, জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্য ব্যয়ের সমন্বিত চাপ পারিবারিক বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের সামনে এখন একদিকে আমদানি ব্যয় ও রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ সামলানোর বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব সীমিত রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি কতটা স্থায়ী হয় এবং দেশে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হয়, তার ওপর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।
এবি পার্টি অবিলম্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কম রাখা এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কাঠামোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।