মরিনিওর হাতে দুই ছবি, রেফারিং নিয়ে তীব্র ক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
মরিনিওর হাতে দুই ছবি, রেফারিং নিয়ে তীব্র ক্ষোভ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদ্রিদ ডার্বির উত্তাপ মাঠের শেষ বাঁশির পরও থামেনি। আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ২-১ গোলে হারের পর রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জোসে মরিনিও সংবাদ সম্মেলনে এসে এমন এক দৃশ্য তৈরি করেছেন, যা ম্যাচের বিতর্ককে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। হাতে ছিল এ–ফোর কাগজে প্রিন্ট করা দুটি ছবি। মরিনিওর দাবি, ওই দুই ছবিতে দেখা ফাউলের জন্য আতলেতিকোর দুই খেলোয়াড়েরই লাল কার্ড পাওয়া উচিত ছিল।

রোববার রাতে মাদ্রিদের রিয়াদ এয়ার মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে লা লিগার মৌসুমের প্রথম মাদ্রিদ ডার্বিতে মুখোমুখি হয়েছিল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ম্যাচে প্রথমার্ধেই তৈরি হয় দুটি বড় বিতর্ক। পরে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদ একজন খেলোয়াড় হারিয়ে ১০ জনে পরিণত হলে ম্যাচের ভারসাম্য আরও বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত আতলেতিকো জয় পায় ২-১ ব্যবধানে।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ঢুকেই মরিনিও বুঝিয়ে দেন, সেদিন তাঁর আলোচনার মূল বিষয় ফুটবলীয় কৌশল নয়, বরং রেফারিং। হাতে থাকা কাগজের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন না করলেও চলত, কারণ ম্যাচের গল্প ওই ছবিগুলোতেই রয়েছে। এরপর তিনি দুটি ছবি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

মরিনিওর বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিতে থাকা দুই ঘটনাই ছিল সরাসরি লাল কার্ডের যোগ্য। তাঁর যুক্তি ছিল, রিয়াল মাদ্রিদকে যখন ১১ জনের বিপক্ষে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়েছে, তখন প্রথমার্ধেই যদি আতলেতিকোর দুই খেলোয়াড় মাঠের বাইরে চলে যেতেন, ম্যাচের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। রিয়াল কোচ অবশ্য তাঁর বক্তব্যে সরাসরি কোনো ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেননি। বরং তিনি দাবি করেন, তিনি বিশ্বাস করতে চান যে এগুলো রেফারির ভুল সিদ্ধান্ত।

প্রথম বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে। বল দখলের লড়াইয়ে রিয়ালের জুড বেলিংহামের সঙ্গে আতলেতিকোর ক্রিস্তিয়ান ‘কুটি’ রোমেরোর সংঘর্ষ হয়। রেফারি মিগেল আনহেল অর্তিস আরিয়াস প্রথমে বেলিংহামকে হলুদ কার্ড দেখান। পরে ভিএআরের পরামর্শে ঘটনাটি পর্যালোচনা করতে মনিটরের কাছে যান তিনি। পর্যালোচনার পর বেলিংহামের হলুদ কার্ড প্রত্যাহার করা হলেও রোমেরোকেও শুধু হলুদ কার্ড দেখানো হয়।

রিয়ালের অভিযোগ, ওই ঘটনায় রোমেরোর বুটের স্টাড বেলিংহামের হাঁটুতে আঘাত করে। মরিনিওর মতে, ঘটনাটি লাল কার্ড দেখানোর মতো গুরুতর ছিল। রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচ রিপোর্টেও ঘটনাটিকে বড় বিতর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ক্লাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রোমেরোকে মাঠ ছাড়ানো উচিত ছিল। তবে এটি রিয়াল মাদ্রিদের অবস্থান; ম্যাচ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্ন।

এর কয়েক মিনিট পর আরও একটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। আতলেতিকোর দক্ষিণ কোরিয়ান মিডফিল্ডার লি কাং-ইনের চ্যালেঞ্জে রিয়ালের ফেদেরিকো ভালভের্দে মাটিতে পড়ে যান। রিয়ালের অভিযোগ, কাং-ইনের বুটের স্টাড ভালভের্দের বাঁ গোড়ালিতে আঘাত করে। এই ঘটনায় আতলেতিকোর খেলোয়াড়কে কোনো কার্ড দেখানো হয়নি। মরিনিও ঘটনাটিকেও সরাসরি লাল কার্ডের যোগ্য বলে মনে করেন। ভালভের্দের চোটের মাত্রা নির্ধারণে পরে আরও পরীক্ষা করার কথা জানানো হয়

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। ৫০ মিনিটে রিয়ালের ডিন হাউসেনের বিরুদ্ধে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। প্রথমে তাঁকে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও ভিএআরের পরামর্শে রেফারি আবার ঘটনাটি দেখেন। এরপর হাউসেনকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। পেনাল্টি থেকে গোল করে আতলেতিকোকে এগিয়ে দেন আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো।

এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ খেলোয়াড়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আতলেতিকো ব্যবধান বাড়ায়। জোনাথন ডেভিডের গোলে দলটি ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। রিয়াল শেষ দিকে লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা করে এবং ৮৯ মিনিটে আন্তোনিও রুডিগারের গোলে ব্যবধান কমায়। কিন্তু সমতা ফেরানোর মতো আর সময় পায়নি মরিনিওর দল। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আতলেতিকো।

এই ফলের পর স্বাভাবিকভাবেই রিয়ালের জন্য হতাশা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মরিনিওর অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল খেলোয়াড়সংখ্যার বৈষম্য। তাঁর বক্তব্য, প্রথমার্ধের দুটি ঘটনায় আতলেতিকোর দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড পেলে ম্যাচের চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারত। পরে হাউসেনের বহিষ্কারের পর রিয়ালকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হওয়ায় তাঁর সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

রেফারিংয়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ম্যাচ পরিচালনার জন্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মরিনিও। তাঁর দাবি, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য এমন একজন রেফারিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার এই পর্যায়ের ম্যাচে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। একই সঙ্গে তিনি রেফারিং কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে রিয়ালের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ সরাসরি করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, একজন কোচ বা খেলোয়াড় যেমন ভুল করতে পারেন, রেফারি এবং নিয়োগ কমিটিও ভুল করতে পারে।

অন্যদিকে আতলেতিকো কোচ দিয়েগো সিমিওনে বিষয়টিকে দেখেছেন ভিন্নভাবে। ম্যাচের পর মরিনিওর মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোচদের বক্তব্য দেওয়ার সময় দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, রেফারি, প্রতিপক্ষের কোচ এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি। কোনো পক্ষ সেই সীমা অতিক্রম করলে সেটি ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাদ্রিদ ডার্বির মতো উচ্চচাপের ম্যাচে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবার বিতর্কের মাত্রা বাড়িয়েছে মরিনিওর সংবাদ সম্মেলনের সেই দুটি ছবি। সাধারণত কোচরা ম্যাচের কৌশল, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স কিংবা নিজেদের ভুল নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু মরিনিও এবার কথার পাশাপাশি দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে তিনি যে ঘটনাগুলোকে দেখছেন, সেগুলোর স্থিরচিত্র সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে ম্যাচের ফলের সঙ্গে রেফারিং নিয়েও আলোচনা সমানতালে চলছে।

রিয়ালের জন্য এই হার শুধু স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে পয়েন্ট হারানো নয়, লিগের শীর্ষস্থানের দৌড়েও এর প্রভাব পড়েছে। সাত ম্যাচ শেষে বার্সেলোনা শীর্ষে রয়েছে। আতলেতিকো এই জয়ে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে ওপরের দিকে উঠে এসেছে, আর রিয়ালও শীর্ষস্থান থেকে ব্যবধান বাড়তে দেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বিরতির আগে মাদ্রিদ ডার্বির এই পরাজয় রিয়ালের জন্য আরও চাপ তৈরি করেছে।

তবে মাঠের বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সামনে রেখে গেছে—রেফারির সিদ্ধান্তগুলো ম্যাচের ফল কতটা প্রভাবিত করেছে? মরিনিওর উত্তর স্পষ্ট। তাঁর হাতে থাকা দুটি ছবি ছিল সেই প্রশ্নেরই প্রতীকী উত্তর। অন্যদিকে আতলেতিকোর দৃষ্টিতে জয় এসেছে প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড় কমে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে, নিজেদের আক্রমণভাগের কার্যকারিতা এবং ম্যাচের শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মাধ্যমে। ফলে ডার্বির তিন পয়েন্ট আতলেতিকোর ঘরে গেলেও, ম্যাচের বিতর্ক আপাতত থামছে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত