‘সারের সংকট নেই’ বলা কুড়িগ্রামের কৃষি কর্মকর্তা বদলি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
‘সারের সংকট নেই’ বলা কুড়িগ্রামের কৃষি কর্মকর্তা বদলি

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামে চলতি আমন মৌসুমে সার বিতরণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকট, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে ‘সারের সংকট নেই’ বলে মন্তব্য করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে কুড়িগ্রাম থেকে ঝিনাইদহে বদলি করে বীজ প্রত্যয়ন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার বদলির আদেশ ঘিরে জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কামরুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত ওই আদেশে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ঝিনাইদহ জেলার বীজ প্রত্যয়ন অফিসার হিসেবে বদলির কথা জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে আদেশের কপি কুড়িগ্রামে পৌঁছানোর পর বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে সারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সার বিতরণকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। কোথাও পর্যাপ্ত সার না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, কোথাও আবার সার সংগ্রহে কৃষকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর সঙ্গে বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগও যুক্ত হয়। ফলে কৃষকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে কৃষি বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আমন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন মৌসুম। এ মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে সার প্রয়োগ করা না গেলে ধানের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সময়মতো সার পাওয়া উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি ফলনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সামান্য ব্যাঘাতও মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কুড়িগ্রাম কৃষিনির্ভর একটি জেলা হওয়ায় আমন মৌসুমে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার ওপর তাদের চাষাবাদের পরিকল্পনা নির্ভর করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সার নিয়ে সংকটের অভিযোগ এবং একই সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট নেই—এমন বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সার বিতরণ পরিস্থিতি নিয়ে নানা অভিযোগের মধ্যেই তার ‘সারের সংকট নেই’ মন্তব্যটি আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে সার বিতরণে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা এবং কৃষকদের ভোগান্তি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলতে থাকে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে তার বদলির আদেশ আসে।

আদেশে তাকে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলের মধ্যে নতুন কর্মস্থল ঝিনাইদহে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বদলির সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাকে দ্রুত নতুন দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনিক ভাষায় স্ট্যান্ড রিলিজের অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের সুযোগ তৈরি করা। ফলে কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি বিভাগের নেতৃত্বেও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসে।

আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ি, ঢাকার প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবীরকে। তাকে কুড়িগ্রামে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর জেলার সার বিতরণ ও কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে তিনি কী ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেন, সেটিও এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে থাকবে।

বদলি আদেশের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন নিজেও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাকে ঝিনাইদহে বদলি করা হয়েছে এবং তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন। তার বক্তব্যে বদলির বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে মন্ত্রণালয়ের আদেশে উল্লেখিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বাইরে এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও জানা যায়নি।

এদিকে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। একজন কর্মকর্তার বদলি বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছানো, বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত কৃষক যাতে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সার পান—এসব বিষয় কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাব তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন কৃষক পর্যায়ে তার বাস্তব সুফল পৌঁছাবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আমন মৌসুমে সার ব্যবস্থাপনা শুধু সরবরাহের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে মজুত, পরিবহন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ, কৃষকের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি। এসব ধাপে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে গুদামে সার থাকার পরও কোনো কোনো এলাকায় কৃষক সংকটের মুখে পড়তে পারেন। আবার চাহিদা ও সরবরাহের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় না থাকলেও পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

কুড়িগ্রামে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ব্যবস্থাপনার গুরুত্বই নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে কৃষকদের সার পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার বক্তব্য এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বদলি—সব মিলিয়ে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তবে বদলির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিবর্তন এলেও সার সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং কৃষকদের ভোগান্তি কতটা কমে, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নতুন উপপরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলার বিভিন্ন এলাকার সার বিতরণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা, কৃষকদের অভিযোগ শোনা এবং সংশ্লিষ্ট ডিলার ও মাঠ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে পারেন। বিশেষ করে আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য রাখা হলে উৎপাদন কার্যক্রমে স্বস্তি ফিরতে পারে।

কুড়িগ্রামের কৃষকদের কাছে তাই প্রশাসনিক বদলির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মাঠপর্যায়ে সার পাওয়ার নিশ্চয়তা। কৃষি বিভাগের নতুন নেতৃত্ব কীভাবে সার বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনের পরিস্থিতি। আমন মৌসুমে কৃষকের শ্রম, সময় ও বিনিয়োগ যাতে সারসংকট বা বিতরণ জটিলতার কারণে ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত