জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধ ও সম্পদের নতুন বিতর্ক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে যুদ্ধ ও সম্পদের নতুন বিতর্ক

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভাষণ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। মঙ্গলবার দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যের একটি বিশেষ অংশে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে-ই পাবে’—যা জাতিসংঘের মঞ্চে যুদ্ধের ফলাফল ও অর্থনৈতিক সম্পদের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এরপর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সমঝোতা ও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সামনে আসে। মঙ্গলবার জাতিসংঘে ভাষণ দিতে গিয়ে ট্রাম্প সেই সামরিক অভিযান ও পরবর্তী তেলসম্পদ-সংক্রান্ত ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ককে তাঁর প্রশাসনের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে তাঁর ‘বিজয়ীর লুটের মাল’ মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সামরিক বিজয়কে অন্য রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্বয়ংক্রিয় অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যের এই অংশটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বিরোধকে সামরিক শক্তির পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি ও সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলা করা। জাতিসংঘ সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের চতুর্থ ধারায় অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আত্মরক্ষার অধিকার এবং নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের মতো নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোয় স্বীকৃত। এই বাস্তবতার মধ্যেই ট্রাম্প জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ভাষণে ইরান প্রসঙ্গও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প বলেন, তাঁর সামনে বড় সিদ্ধান্ত হলো ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো, নাকি দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার পথে যাওয়া। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা বলেন এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশাবাদও প্রকাশ করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন।

ইরান নিয়ে তাঁর বক্তব্যের সময় দেশটির প্রতিনিধিদলের কয়েকজন সদস্য অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে কিউবার প্রতিনিধিরাও ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি পর্যায়ে অধিবেশন ত্যাগ করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর কঠোর সমালোচনা। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সমালোচনা করে দেশগুলোকে প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেন এবং প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখার ওপর জোর দেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে অভিহিত করার কথাও বলেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জাতিসংঘের অঙ্গ নয়; এটি রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি পৃথক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে ট্রাম্পের এই সমালোচনা জাতিসংঘের সরাসরি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বক্তব্যের চেয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও বহুপক্ষীয় কাঠামো নিয়ে তাঁর অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভাষণে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার কথাও গুরুত্ব পায়। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। মেক্সিকো, কিউবা ও অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশের প্রসঙ্গেও তিনি কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। কিউবার বিষয়ে তিনি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং সেখানে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এই অবস্থানকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পশ্চিম গোলার্ধকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তবে ট্রাম্পের বর্তমান বক্তব্যে সেই ধারণার পরিধি আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি শুধু পশ্চিম গোলার্ধ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ যেখানে হুমকির মুখে পড়বে বলে তাঁর প্রশাসন মনে করবে, সেখানেও শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

জাতিসংঘের মঞ্চে এমন বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক নিরাপত্তার ধারণা। কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র সামরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে দুর্বল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করবে বা তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়।

ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। তবে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেল মজুতের হিসাব এবং বর্তমান উৎপাদনের হিসাব এক নয়। ফলে ট্রাম্পের দেওয়া পরিসংখ্যানকে একই অর্থে গ্রহণ করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্মিলিত অংশকে বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুতের ৬০ শতাংশের কাছাকাছি নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষণের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর প্রশাসনের অর্থনীতি, জ্বালানির দাম ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। রয়টার্স/ইপসসের সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান তাঁর জাতিসংঘের বক্তব্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেয় না; বরং এটি ভাষণটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য।

ট্রাম্প অবশ্য তাঁর সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে স্বীকার করেননি। বরং তিনি জাতীয় নিরাপত্তা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে তাঁর নীতির প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেসব ব্যাখ্যা সামনে আসছে, সেগুলোকে বিশ্লেষণ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনের শাসনের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। এর বিপরীতে ট্রাম্পের বক্তব্যে জাতীয় শক্তি, সামরিক সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই মঞ্চে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও জাতীয় শক্তিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের এবারের ভাষণকে তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। ভেনেজুয়েলার তেল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পশ্চিম গোলার্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বক্তব্য মিলিয়ে এতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতীয় স্বার্থ ও সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে সামনে এসেছে।

আর ‘বিজয়ীর লুটের মাল’—এই মন্তব্যটি বিশেষভাবে আলোচিত হওয়ার কারণ হলো, এটি যুদ্ধের সামরিক ফলাফল এবং অর্থনৈতিক সম্পদের অধিকারের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের মতো শোনায়। আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোতে যুদ্ধের ফলাফলকে এভাবে অন্য রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর স্বয়ংক্রিয় মালিকানার ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, সার্বভৌমত্ব, সম্পদ ও আইনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্কের দরজা খুলেছে।

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার আট দশক পর বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি দেশের প্রেসিডেন্ট যখন একই মঞ্চে সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সেই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি কেবল নিউইয়র্কের কূটনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো, রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং যুদ্ধের পর সম্পদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত