বিভক্ত বিশ্বে নতুন সহযোগিতার ডাক কানাডার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৭ বার
বিভক্ত বিশ্বে নতুন সহযোগিতার ডাক কানাডার

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বিভাজন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন একটি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব এমন এক পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা একটি শতাব্দীতে খুব কমবারই দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় যে বড় ধরনের পরিবর্তন ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে দেশগুলোকে নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় নতুন ধরনের সহযোগিতার পথ খুঁজে নিতে হবে।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে একদিকে যেমন অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে।

কার্নির মতে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই ধরে রাখার ওপর নির্ভর করতে পারে না। একই সঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর ঘোষণা করে বাস্তবতার কঠোর হিসাবের ভিত্তিতে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমাধান নয়। তিনি এর পরিবর্তে যে ধারণার কথা বলেছেন, সেটিকে ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতি ও মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি এবং অভিন্ন স্বার্থকেও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক আলোচিত বক্তব্যে কার্নি বিশ্বের ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে সেই সময় এ ধরনের সহযোগিতা কীভাবে বাস্তবে কার্যকর করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কাঠামো তুলে ধরেননি। নিউইয়র্কে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি সেই ধারণার আরও বিস্তৃত রূপরেখা সামনে এনেছেন।

কার্নি জানিয়েছেন, ‘পার্টনার্স ফর মাল্টিল্যাটারালিজম’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তার ব্যাখ্যায়, এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হবে না। একইভাবে এটি কোনো নতুন আমলাতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিকল্পনাও নয়। বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন অংশীদারত্ব এবং সরকারের বাইরের সক্ষমতাগুলোকে একত্র করে দেশগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোর একটি নমনীয় কাঠামো হিসেবে উদ্যোগটি কাজ করতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নমনীয় অংশীদারত্বের ধারণা। তার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে হয় পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে হবে, নয়তো একেবারে পরিত্যাগ করতে হবে—বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরং যে সমস্যার সমাধানে যে দেশগুলোর অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা বা স্বার্থ সবচেয়ে বেশি জড়িত, তাদের নিয়ে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তোলা যেতে পারে।

এই ধরনের সহযোগিতায় কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান বা অর্থনৈতিক আকারই একমাত্র বিবেচ্য হবে না। বরং নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা সমাধান এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দেশগুলো একত্র হতে পারে। কোনো উদ্যোগে একটি দেশ স্থায়ীভাবে যুক্ত থাকবে, এমন বাধ্যবাধকতাও থাকবে না। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী অংশগ্রহণকারীদের পরিবর্তন হতে পারে। কার্নির মতে, এ ধরনের কাঠামো বহুপাক্ষিকতার বিকল্প নয়; বরং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে বাস্তবে আরও কার্যকর করার একটি উপায় হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয়ে কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি সমুদ্র পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কানাডার সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ছোট পরিসরে কয়েকটি দেশ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারলে পরে সেই উদ্যোগকে জাতিসংঘসহ বৃহত্তর বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ঐতিহ্যগত মিত্রদের পাশাপাশি ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের দেশগুলোর সঙ্গেও কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন কার্নি। তার মতে, কানাডার মতো দেশগুলোকে নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব দেশের মূল্যবোধ বা রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন, তাদের সঙ্গেও নিজেদের স্বার্থ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।

কার্নির এই অবস্থানের সঙ্গে কানাডার সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও যুক্ত হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন ধরনের চুক্তি ও সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা কানাডার সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে কার্নির উপস্থিতিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তার মূল কর্মসূচিতে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। সময়সূচির জটিলতার কারণে তিনি অধিবেশনে বক্তৃতা দেবেন না। তবে নিউইয়র্কে কয়েক দিন অবস্থান করে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন তিনি।

কানাডার সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কার্নির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। এত বেশি বৈঠকের অনুরোধ এসেছে যে তার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবগুলো বৈঠক রাখা সম্ভব হয়নি। এতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে কানাডার কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে।

নিউইয়র্ক সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কার্নি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, জাতিসংঘের অধিবেশন উপলক্ষে যখন বিপুলসংখ্যক বিশ্বনেতা নিউইয়র্কে উপস্থিত হন, তখন সাধারণত যাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার মধ্যেও বিশেষ মূল্য রয়েছে।

ট্রাম্পের জাতিসংঘের ভাষণে ইরানকে নিয়ে দেওয়া কঠোর বক্তব্য এবং যুদ্ধের ভাষা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কার্নি বলেন, একটি যুদ্ধ চলছে এবং ট্রাম্প যুদ্ধের ভাষায় কথা বলছেন। তার এই মন্তব্যে কানাডার অবস্থানও প্রকাশ পেয়েছে যে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় সামরিক সংঘাতের বাস্তবতা যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগও খোলা রাখতে হবে।

কার্নির বক্তব্যের সামগ্রিক দিক থেকে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে, তখন কানাডার মতো দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ ও মূল্যবোধ রক্ষায় কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করবে, সেই প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

কার্নির প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা এবং নির্দিষ্ট সংকট মোকাবিলায় তাদের সমন্বয়ের সক্ষমতার ওপর। তবে তার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শুধু পুরোনো কাঠামো হিসেবে ধরে রাখার পরিবর্তে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহযোগিতার নতুন পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা তিনি সামনে আনছেন। বিভক্ত বিশ্বে সেই নতুন সহযোগিতার ধারণাই কানাডার পররাষ্ট্রনীতিতে আগামী দিনে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত