প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিকে ‘কৌশলগত হতাশার’ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও তীব্র ও বিধ্বংসী পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
ইরানের জেনারেল স্টাফের এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মঞ্চ ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইরানের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের বক্তব্যকে দুই দেশের চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অচলাবস্থারই প্রতিফলন হচ্ছে ট্রাম্পের বক্তব্য। দেশটির সামরিক নেতৃত্বের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানকে ধ্বংস বা নিশ্চিহ্ন করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার হুমকি শক্তির প্রকাশ নয়; বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
তবে ইরানের এই বক্তব্য দেশটির সামরিক অবস্থানের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাব দিয়েছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি হুমকির মাত্রাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরানের জেনারেল স্টাফের বিবৃতিতে বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এমন আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত হতে পারে। তবে বিবৃতিতে সম্ভাব্য হামলার নির্দিষ্ট সময়, স্থান বা সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইরানের পক্ষ থেকে এমন কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানানোর ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পাল্টাপাল্টি হুমকি, সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নতুন করে প্রকাশ্য হুমকি বিনিময় সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে এ ধরনের বক্তব্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যখন একই মঞ্চে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ, কূটনীতি ও শান্তি নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক হুমকি আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়ে। ইরানের অভিযোগ, এই আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্যবহার করেই ট্রাম্প তার দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
ইরানের সামরিক বাহিনী অবশ্য তাদের বিবৃতিতে শুধু ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি; সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে। দেশটির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তাহলে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য তাদের বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়াকে প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানসংক্রান্ত বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনাও তৈরি হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বৈরিতাপূর্ণ। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন হুমকি এবং তার বিপরীতে ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া পুরোনো বিরোধকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপকে কৌশলগত অচলাবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের পরও যুক্তরাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি এবং সে কারণেই ট্রাম্পের বক্তব্যে হুমকির ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি অবশ্য ইরানের সামরিক নেতৃত্বের নিজস্ব মূল্যায়ন; এর সত্যতা বা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত এই বক্তব্য থেকে টানা যায় না।
একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকে আরও বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত হামলার হুমকিকেও দেশটির সামরিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই ধরনের বক্তব্যের বাস্তব সামরিক পরিকল্পনা কী এবং ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা কতটা, তা বিবৃতিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রকাশ্য বক্তব্যের বাইরে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কূটনৈতিক আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগও এ ধরনের আন্তর্জাতিক সমাবেশে তৈরি হতে পারে। তবে প্রকাশ্য বক্তব্যে কঠোর অবস্থান নেওয়া সেই কূটনৈতিক পরিবেশকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
ইরানের জেনারেল স্টাফের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট যে তেহরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতির বার্তা দিতে চাইছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের অবস্থানও কঠোরভাবে প্রকাশ পেয়েছে বলে ইরান মনে করছে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে আপাতত সমঝোতার চেয়ে প্রতিরোধ, চাপ ও পাল্টা জবাবের ভাষাই বেশি দৃশ্যমান।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কারণ সামরিক হুমকি যত বাড়ে, ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘাতের ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো ইতোমধ্যে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে সামান্য কোনো সামরিক ঘটনাও দ্রুত বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা থাকে।
ইরানের সামরিক বাহিনী এখন যে বার্তা দিয়েছে, তার মূল বিষয় হলো—দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে। ট্রাম্পের বক্তব্যকে তারা কৌশলগত হতাশা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে এবং একই সঙ্গে নিজেদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
এখন পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর। দুই পক্ষের বক্তব্য যদি আরও কঠোর হয়, তাহলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। আবার কূটনৈতিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক উদ্যোগ সক্রিয় হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগও তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।