নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ চায় জি৪

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ চায় জি৪

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপানের জোট জি৪। চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর করার জন্য সংস্কার প্রক্রিয়ায় বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে জি৪-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ডেভিড ওয়াডেফুল এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসু অংশ নেন। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আগামী দিনের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। পরে চার দেশ একটি যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বিবৃতি প্রকাশ করে।

যৌথ বিবৃতিতে জি৪-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংকট বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাটির কার্যকারিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি।

জি৪ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছে। চার দেশের বর্তমান অবস্থান হলো, শুধু অস্থায়ী সদস্যপদ বাড়ালেই কাঠামোগত ভারসাম্য তৈরি হবে না; স্থায়ী ও অস্থায়ী—দুই ধরনের সদস্যপদই সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি আলোচনায় অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্র স্থায়ী ও অস্থায়ী—উভয় শ্রেণির সদস্য বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিন্যাসকে অনেকাংশে প্রতিফলিত করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে ভূমিকা বেড়েছে। জি৪-এর যুক্তি হলো, এই পরিবর্তন জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কাঠামোতেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

চার দেশ বিশেষভাবে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। জি৪-এর বিবৃতিতে আফ্রিকার পাশাপাশি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া বা প্রতিনিধিত্বহীন দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হতে পারে বলে তারা মনে করছে।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ডেভিড ওয়াডেফুলও জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বে ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের এই পরিবর্তন জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাতেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বিশেষভাবে আফ্রিকার দেশগুলোর মতামত ও প্রতিনিধিত্ব আরও যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

জি৪-এর জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংস্কার আলোচনায় দীর্ঘসূত্রতা। চার দেশ জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার নিয়ে আন্তঃসরকারি আলোচনা বহু বছর ধরে চলছে, কিন্তু এখনো কাঙ্ক্ষিত বাস্তব ফল পাওয়া যায়নি। চলমান আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং লিখিত বা টেক্সটভিত্তিক আলোচনা দ্রুত শুরু করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

জি৪-এর মতে, নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ ও আঞ্চলিক জোটের প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবকে সমন্বয় করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্রের মতামত প্রতিফলিত হয়। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জি৪ বর্তমান অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে একটি সমন্বিত মডেল তৈরির দিকে এগোতে চায়। এ প্রক্রিয়ায় বর্তমান স্থায়ী সদস্য এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গেও কাজ করার কথা জানিয়েছে চার দেশ।

নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে আলোচনায় আফ্রিকার অবস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও এবারের বৈঠকে উঠে এসেছে। আফ্রিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মহাদেশটির ঐতিহাসিক ও বর্তমান বৈশ্বিক ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব দাবি করে আসছে। জি৪ সেই দাবির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চার দেশের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি কার্যকর সংস্কার প্রক্রিয়ায় আফ্রিকার অবস্থান ও প্রস্তাবকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

জি৪ আরও মনে করে, নিরাপত্তা পরিষদের বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে এর প্রতিনিধিত্ব কতটা বিস্তৃত এবং বাস্তব বিশ্বের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ওপর। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যদি বিশ্বের বড় অঞ্চলগুলোর পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—এমন অবস্থানই তুলে ধরেছে জোটটি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বৈঠকের পর বলেন, ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার এবং আরও প্রতিনিধিত্বশীল, সাড়া দিতে সক্ষম ও কার্যকর নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

জি৪-এর চার দেশ নিজেদের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নিজ নিজ দেশের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার বিষয়ে তারা একমত হয়েছে। ওই বৈঠক নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রশ্নে জি৪-এর অবস্থানের সঙ্গে তাদের নিজেদের প্রার্থিতার বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে এবং পরস্পরের প্রার্থিতাকে সমর্থন করে। তবে এই দাবির বাস্তবায়ন নির্ভর করছে জাতিসংঘের বৃহত্তর সদস্যদের মধ্যে সমঝোতা এবং সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য কাটিয়ে ওঠার ওপর।

নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমানে পাঁচটি স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রের বিশেষ অবস্থান রয়েছে এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে নির্বাচিত অস্থায়ী সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। এই কাঠামো কীভাবে পরিবর্তন করা হবে, নতুন স্থায়ী সদস্যদের কী ধরনের অধিকার থাকবে এবং ভেটো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব বিষয় সংস্কার আলোচনার সবচেয়ে জটিল অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

জি৪-এর সাম্প্রতিক বক্তব্যে এসব সব প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান দেওয়া হয়নি। বরং তারা আলোচনাকে পরবর্তী ধাপে নেওয়া, বিভিন্ন প্রস্তাবকে সমন্বয় করা এবং দ্রুত লিখিত আলোচনা শুরু করার ওপর জোর দিয়েছে। চার দেশ বলেছে, অধিকাংশ সদস্যরাষ্ট্রের অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর সংস্কার প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করা হবে।

জাতিসংঘের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিবেশে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের সংকট এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে। এ বাস্তবতায় জি৪ মনে করছে, পুরোনো কাঠামোর পরিবর্তে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিনের এই সংস্কার আলোচনা বাস্তবে কতটা এগোয়। জি৪ চলতি জাতিসংঘ অধিবেশনে লিখিত আলোচনার দিকে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকা ও অন্যান্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি বিস্তৃত সংস্কার মডেল তৈরির চেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবারের জি৪ বৈঠক নতুন করে গতি তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে সামনে এসেছে। তবে চূড়ান্ত সংস্কারের জন্য জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিস্তৃত সমঝোতা প্রয়োজন হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত