প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সরকারের ভর্তুকিমূল্যের খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য নতুন করে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই ডাল সংগ্রহ করা হবে। এতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারগুলোর মধ্যে নিয়মিত খাদ্যপণ্য বিতরণ কার্যক্রমে এই ডাল ব্যবহার করা হবে।
বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মসুর ডাল কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে তা পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার আওতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার গ্যারান্টির মাধ্যমে এ ব্যয় নির্বাহের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের এই ক্রয় সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য হচ্ছে টিসিবির খাদ্যপণ্যের মজুদ শক্তিশালী করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য নিয়মিতভাবে পৌঁছে দেওয়া। বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ওঠানামা করলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ে। এ অবস্থায় ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করে থাকে সরকার।
নতুন করে কেনার অনুমোদন পাওয়া মসুর ডাল স্থানীয় বাজার থেকেই সংগ্রহ করা হবে। এ জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। দরপত্র প্রক্রিয়ায় মোট চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতা হিসেবে খুলনার জয়তুন অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেডকে ডাল সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে।
টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির দর গ্রহণ করা হয়েছে। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়সহ প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ টাকা ৮৯ পয়সা। অর্থাৎ নির্ধারিত ১০ হাজার মেট্রিক টন ডালের জন্য মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৭৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাইয়ের পর এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির জন্য মোট ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এরই মধ্যে ১৭ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহ করা হয়েছে। নতুন করে আরও ১০ হাজার মেট্রিক টন কেনার অনুমোদন পাওয়ায় সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক সংগ্রহ পরিকল্পনার আওতায় টিসিবির মজুদ আরও বাড়বে।
টিসিবির মজুদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্য হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফ্যামিলি কার্ডধারীদের জন্য নির্ধারিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন সময় চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হয়। কোনো একটি পণ্যের মজুদ কমে গেলে নিয়মিত বিতরণ কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে। নতুন করে মসুর ডাল সংগ্রহের মাধ্যমে সেই সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য মসুর ডাল একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য। দেশের অনেক পরিবারে ডাল প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অংশ হলেও বাজারদর বেড়ে গেলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য তা নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে উপার্জনকারী সদস্যের সংখ্যা কম, তাদের মাসিক খাদ্যব্যয়ের একটি অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। সরকারি ভর্তুকি কর্মসূচির মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগ তাই এসব পরিবারের জন্য সরাসরি আর্থিক স্বস্তি তৈরি করতে পারে।
টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির নিম্ন আয়ের পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা হয়। এই কর্মসূচিতে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আগাম সংগ্রহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সেই ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ডাল সরবরাহ করতে হবে। টিসিবির গুদাম পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়ও অনুমোদিত দরের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে ক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর পণ্য গ্রহণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে গুণগত মান ও নির্ধারিত সরবরাহ শর্ত নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখন পর্যন্ত সংগৃহীত পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে সামনে আরও মসুর ডাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজন হতে পারে। নতুন করে অনুমোদিত ১০ হাজার মেট্রিক টন সেই বৃহত্তর সংগ্রহ পরিকল্পনার একটি অংশ।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে নির্ধারিত সুবিধাভোগীদের কাছে পণ্য বা সহায়তা সময়মতো পৌঁছানোর ওপর। খাদ্যপণ্যের মজুদ পর্যাপ্ত থাকলে বিতরণ ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়। বিপরীতে মজুদ সংকট তৈরি হলে পরিবহন, সরবরাহ ও বিতরণ—সব পর্যায়েই চাপ বাড়তে পারে। তাই টিসিবির জন্য নিয়মিত পণ্য সংগ্রহকে শুধু একটি সরকারি ক্রয় কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নতুন করে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের অনুমোদন সরকারের খাদ্যপণ্য মজুদ পরিকল্পনায় আরও একটি সংযোজন। এর মাধ্যমে টিসিবির গুদামে মসুর ডালের মজুদ বাড়বে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডধারীদের মধ্যে তা বিতরণের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বা সরবরাহ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলে সরকারি মজুদ কার্যক্রম নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সুফল কতটা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে ক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, গুদামজাতকরণ এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনার ওপর। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত মান বজায় রাখার পাশাপাশি সুবিধাভোগীদের কাছে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরে টিসিবির জন্য নির্ধারিত বড় সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে নতুন ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৭৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকার এই ক্রয়ের মাধ্যমে সংস্থাটির মজুদ আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে নিয়মিত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় থাকা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে ভর্তুকিমূল্যে মসুর ডাল সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।