এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ার আশা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
এডিবির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ার আশা

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাব্য গতি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেন, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এডিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। তবে এই পুনরুদ্ধার এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

এডিবির হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এরপর চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম ধীরে ধীরে বাড়লে এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে এডিবির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি অর্থনীতির সামনে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকির কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এডিবি। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং বাংলাদেশের ভেতরেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে এখনো ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না। তার বক্তব্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে।

এডিবির মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও বিনিয়োগ পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এডিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমভাগে জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে এলে মানুষের ভোগব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে। মানুষের ভোগ এবং বিনিয়োগের এই সম্ভাব্য বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে পারে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

তবে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়লেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকতে পারে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কিন্তু ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে এডিবি। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের আশঙ্কা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি এল নিনোর মতো আবহাওয়াজনিত প্রভাব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াতে পারে। মুদ্রানীতি ধীরে ধীরে শিথিল করা হলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

মূল্যস্ফীতির এই পরিস্থিতি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় দ্রুত বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করার জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এডিবি বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও কিছুটা চাপের পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এই ঘাটতি বেড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি বাড়ার কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে বলে মনে করছে এডিবি।

তবে বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সকে একটি ইতিবাচক উপাদান হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো থাকতে পারে বলে এডিবির পূর্বাভাস। রেমিট্যান্স বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে।

এ জন্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ পর্যাপ্ত রাখা এবং মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারের চাহিদা ও জোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এডিবি। একই সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সতর্ক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এডিবি একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। আগামী অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। মানুষের ভোগব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় সেবা খাতে কার্যক্রম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে অনেক পরিবারের ব্যয় করার সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর থাকতে পারে বলে মনে করছে এডিবি। উচ্চ সুদহার, ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে শিল্প ও বিনিয়োগে চাপ থাকতে পারে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কিছু কাঠামোগত সমস্যাও প্রবৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বহিরাগত ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দেখছে এডিবি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন ঘটলে আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এসব পরিবর্তনের প্রভাব উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়েও পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এর পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকা এবং ব্যাংক খাতে নতুন সংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে এডিবি।

দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ও প্রবৃদ্ধির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, উন্নয়ন ব্যয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়া এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ অর্থনীতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতির চাপও আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামলানো প্রয়োজন হবে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এডিবির পূর্বাভাস তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের চিত্র তুলে ধরলেও এর সঙ্গে সতর্কতার বার্তাও রয়েছে। সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে পারলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত