পরিবার পরিকল্পনায় বছরব্যাপী ২২ দফা কর্মপরিকল্পনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
পরিবার পরিকল্পনায় বছরব্যাপী ২২ দফা কর্মপরিকল্পনা

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বছরব্যাপী ২২ দফা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। দেশের জাতীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা, পরামর্শ, চিকিৎসা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছর ধরে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন এই কর্মপরিকল্পনায় সাধারণ জনগণের পাশাপাশি তরুণ ও কিশোর-কিশোরী, নবদম্পতি, পুরুষ, গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, বস্তিবাসী, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশুস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য ও সেবা নিশ্চিত করতে পারলে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, মাতৃস্বাস্থ্যঝুঁকি ও শিশুস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সেমিনারে এক বছরের এই কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। ‘মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রচার-প্রচারণা ও ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সেমিনারে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এক বছরে প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হাট-বাজারভিত্তিক প্রচারণা, র‌্যালি, সমন্বয় সভা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার শুরুতেই নভেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে মহিলা সংসদ সদস্যদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন আয়োজন এবং দেশের ৬৪ জেলা ও ৫০৩ উপজেলায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে প্রচার চালানোর কথা রয়েছে।

পরবর্তী ধাপে ডিসেম্বর মাসে ইউনিয়ন পর্যায়ে হাট ক্যাম্পেইন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সময়ে উপজেলা পর্যায়ে আন্তমন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সভা আয়োজন করা হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা সেবা সম্পর্কে মানুষের ধারণা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের চেষ্টা থাকবে।

কর্মপরিকল্পনার আওতায় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও এতে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবার পরিকল্পনা, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য এবং প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

মা ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘মা ও গর্ভবতী সুরক্ষা সমাবেশ’ আয়োজনের পাশাপাশি বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা বা পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শের বাইরে থেকে যেতে পারেন। তাই তাদের কাছে সরাসরি সেবা ও তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় দেশের ২৩ হাজার ৫০০ ইউনিটে ‘ওয়েলবিং ক্লাব’ গঠনের উদ্যোগও রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘পরিবার সংলাপ’ আয়োজনের পাশাপাশি কৈশোর ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, নবদম্পতিদের কাউন্সেলিং এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা শুধু নারীর বিষয় নয়; দম্পতির উভয়ের সচেতনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। এ কারণে পুরুষদের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে তথ্য দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। নবদম্পতিদের শুরু থেকেই পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য ও সন্তান নেওয়ার সময় সম্পর্কে যথাযথ পরামর্শ দিতে পারলে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারি পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিনা মূল্যে পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কেও মানুষকে অবহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পল্লিচিকিৎসক ও ধাত্রীদের রেফারেল অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার পাশাপাশি এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে তাকে উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সেবাদাতার কাছে পাঠানোর সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন কর্মসূচির পাশাপাশি বিদ্যমান মাঠপর্যায়ের সেবাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক সেমিনারে বলেন, অনেকগুলো আলাদা কর্মসূচি বা বড় বাজেট ও জনবলের দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল সেবাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়াই কার্যকর প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। এ জন্য মাঠকর্মীদের নিয়মিত গৃহপরিদর্শন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি জোরদার করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, হাট-বাজারের ফার্মেসিতে বিশেষ কর্নার করে পুরুষদের সহজে প্রয়োজনীয় বিনামূল্যের পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বেসরকারি বাজার থেকে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী কিনে থাকেন। তাদের সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে পাওয়া সামগ্রীর বিষয়ে জানানো প্রয়োজন।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা দেশের জনসংখ্যাগত পরিস্থিতির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে বলেন, ১৯৭৫ সালে দেশে মোট প্রজনন হার বা টিএফআর ছিল ৬ দশমিক ৩। ২০২২ সালে তা ২ দশমিক ১৫-এ নেমে এলেও ২০২৫ সালে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। তাঁর মতে, গত দুই বছর অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় মাঠপর্যায়ে প্রচার এবং প্রয়োজনীয় সংস্থান সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, দেশে বাল্যবিবাহের হার ২৪ শতাংশ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার ৪৯ শতাংশ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে অনিরাপদ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে। এসব পরিস্থিতি পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সফল করার জন্য শুধু প্রচারণা নয়, মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা সহজলভ্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার যদি সচেতন হয় কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেবা, পরামর্শ বা উপকরণ না পায়, তাহলে সচেতনতা কার্যক্রমের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই মাঠকর্মীদের সক্রিয়তা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা, সরবরাহব্যবস্থা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার বিষয়টি নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৈশোরে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য ও পরামর্শের সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে বিয়ে, সন্তান গ্রহণ এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একইভাবে নবদম্পতিদের কাউন্সেলিং পরিবার গঠনের শুরুতেই প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

সেমিনারে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা এতে সভাপতিত্ব করেন। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি সেমিনারে অংশ নেন।

নতুন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা ও মা-শিশুস্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় জনবল ও উপকরণ সরবরাহ, নিয়মিত তদারকি এবং সেবাগ্রহীতাদের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার ওপর। আগামী এক বছরে এসব কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই পরিকল্পনাটির বাস্তব প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত