প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে বিশ্বনেতাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সুলভ ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা এবং জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা তুলে ধরে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের ওপর আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসতভিটা ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ক্ষতির প্রভাব পড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমপরিমাণ। চলতি বছরের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য শুধু নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধরনের ক্ষতি মোকাবিলা করা কঠিন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে সুলভ, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা দরকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং তা সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি না হলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অভিযোজনের কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের লক্ষ্যে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ চলছে। পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জ্বালানি খাতের পরিবর্তনের বিষয়েও বাংলাদেশের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পরিবহন, পাটজাত পণ্য, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সবুজ শিল্পের প্রসারে কাজ করছে সরকার।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানান। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত সুরক্ষার সমন্বয় করা জরুরি। নতুন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও টেকসই করার সুযোগ রয়েছে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যা কোনো একটি দেশের একক উদ্যোগে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে বেশি অবদান রাখা দেশগুলোর পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে কম নিঃসরণকারী কিন্তু বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু মোকাবিলায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমত, প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ওপর তিনি জোর দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সীমিত করতে নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সুলভ অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তৃতীয়ত, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে ন্যায়সংগত ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণের পথ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সুযোগ সীমিত থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে দ্রুত সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর কঠিন হতে পারে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
চতুর্থত, সুলভ অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পায় তাঁর বক্তব্যে।
পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় গঠিত তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি এই তহবিলে নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে যেসব দেশ ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাদের সহায়তায় কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে—এমন অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করে। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, পানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, জীবিকা, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ক্ষেত্রে এসব প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে জলবায়ু বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, দেশের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ বাড়ানোর দাবি আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই এখন অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।