দেবিদ্বারে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
দেবিদ্বারে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি কাঁচামালের আড়ত থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিজন চন্দ্র সাহা (৪৯) নামে এক ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে কৌশলে প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে নগদ ৩০ লাখ ১৬ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার বিজন চন্দ্র সাহা দেবিদ্বার উপজেলার বেগমাবাদ গ্রামের মৃত বীরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ছেলে। তিনি উপজেলার বরকামতা কাঠেরপুল এলাকার ‘মেসার্স আনন্দ বাণিজ্যালয়’ নামের একটি কাঁচামালের আড়তে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে মালিকপক্ষের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই অবস্থান ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিজন চন্দ্র সাহা ওই প্রতিষ্ঠানে মাসিক ২৭ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে চাকরি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সাল থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও হিসাব ব্যবস্থাপনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে অর্থ সরিয়ে নিতে থাকেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি ধরা না পড়ায় আত্মসাতের পরিমাণও একপর্যায়ে বড় অঙ্কে পৌঁছে যায়।

আড়ত কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আত্মসাৎ করা অর্থ বিজন নিজের ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি স্ত্রী ও মায়ের নামে বিভিন্ন আর্থিক হিসাবে জমা রাখেন। এর মধ্যে এফডিআরসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয় ব্যবস্থার কথাও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেনের ধরন এবং কার নামে কত টাকা রাখা হয়েছিল, তা এখন তদন্তের বিষয়।

প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের আর্থিক হিসাব পর্যালোচনার সময় প্রথমে অর্থের গরমিল ধরা পড়ে বলে জানিয়েছে আড়ত কর্তৃপক্ষ। এরপর আগের কয়েক বছরের হিসাবপত্র মিলিয়ে দেখা শুরু হয়। একপর্যায়ে লেনদেনের নথি, হিসাব ও অর্থের প্রবাহ যাচাই করে বিপুল অঙ্কের অর্থের অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের পর বিজনের বিরুদ্ধে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে।

বাদী আনিসুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়। এরপর বিজনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং সামাজিকভাবে বসে বিষয়টির সমাধান করে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বলে দাবি করেন বাদী। এ সময় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি পর্যায়ে না নিয়ে সামাজিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে জানা যায়।

তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। আড়ত কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর বিজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে তিনি আত্মগোপনে চলে গেলে অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সন্ধান না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আড়ত কর্তৃপক্ষ।

এরপর প্রতিষ্ঠানের মালিক আনিসুর রহমান বাদী হয়ে দেবিদ্বার থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিজনের অবস্থান শনাক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের অভিযানে তার কাছ থেকে নগদ ৩০ লাখ ১৬ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আত্মসাতের অভিযোগে উল্লেখ করা পুরো অর্থের মধ্যে কত টাকা নগদ, কত টাকা ব্যাংক হিসাব বা অন্যান্য আর্থিক মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে, সে বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।

বাদী আনিসুর রহমান অভিযোগ করেন, বিজন ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করলেও ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আত্মসাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তার দাবি, সব মিলিয়ে গত ছয় বছরে প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এবং আদালতের প্রক্রিয়ায় অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য যাচাই হওয়ার পরই অর্থ আত্মসাতের প্রকৃত পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট লেনদেন সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।

একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক হিসাব পরিচালনা, নগদ অর্থের লেনদেন এবং ব্যাংক হিসাবের নিয়মিত যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাটি সে বিষয়টিও সামনে এনেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এবং অর্থের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় বিজন চন্দ্র সাহাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা অর্থের উৎস এবং আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এফডিআরসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশ বলছে, তদন্তের অংশ হিসেবে অর্থ কোথা থেকে সরানো হয়েছে, কোন কোন হিসাবে তা স্থানান্তর করা হয়েছে এবং আত্মসাতের অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের সঙ্গে এসব লেনদেনের সম্পর্ক কী—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি সংগ্রহ করে লেনদেনের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করা হবে।

ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের কর্মসম্পর্ক, আস্থা এবং ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। একজন কর্মচারীর ওপর প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের নির্ভরতার সুযোগে যদি সত্যিই বিপুল অর্থের অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষা ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

তবে বিজন চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। পুলিশ বর্তমানে উদ্ধার হওয়া অর্থ, ব্যাংক হিসাব, এফডিআর এবং অন্যান্য আর্থিক নথি যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে। তদন্ত শেষে অর্থ আত্মসাতের প্রকৃত পরিমাণ, পদ্ধতি এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত