র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ শিক্ষার্থী বহিষ্কার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ শিক্ষার্থী বহিষ্কার

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় ১৫ শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই ঘটনায় আরও ৮০ শিক্ষার্থীকে ‘কঠোর সতর্কবার্তা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সতর্কবার্তা পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদেরও বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হবে। এ ছাড়া পৃথক দুটি ঘটনায় একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে আরও চার শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের ৫৪৯তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ওই সভায় বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা উপকমিটির তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের বক্তব্য থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে ১৫ শিক্ষার্থীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একই মেয়াদে চারুকলা অনুষদের এক সিনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে একজন এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে পৃথক অভিযোগে মোট ১৯ শিক্ষার্থী এক বছরের জন্য বহিষ্কারের আওতায় পড়েছেন।

বহিষ্কারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের আবাসিকতাও বাতিল করা হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সুবিধা পাবেন না। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের ফলে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আবাসিক সুবিধাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

র‍্যাগিংয়ের অভিযোগগুলো সামনে আসে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হওয়ার পর। প্রক্টর দপ্তরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে ১৭ থেকে ১৮টি বিভাগ থেকে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগগুলো পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা উপকমিটির কাছে পাঠানো হয়।

প্রক্টর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাওয়া অভিযোগগুলোর মধ্যে ১০টি অভিযোগ শৃঙ্খলা উপকমিটি তদন্ত করেছে। তদন্তের সময় অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভূমিকা এবং অভিযোগের পক্ষে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা করা হয়। এরপর যেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে এক বছরের বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা উপকমিটির সদস্যসচিব ও প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিভাগ থেকে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেসব অভিযোগ তদন্ত করে গুরুতর ও প্রমাণিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে, সেসব ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

তিনি জানান, র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে আরও ৮০ শিক্ষার্থীকে তাঁদের অভিযোগের মাত্রা বিবেচনা করে কঠোর সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁদের পরিবারকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে। অর্থাৎ অভিযোগের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই ধরনের শাস্তি না দিয়ে সংশ্লিষ্টতার মাত্রা ও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

র‍্যাগিং সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ, অপমান, ভয় দেখানো বা হয়রানির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নতুন শিক্ষার্থীদের পরিচিত হওয়ার প্রক্রিয়ার আড়ালে এ ধরনের আচরণ কখনো কখনো গুরুতর হয়রানিতে রূপ নিতে পারে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোতেও বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, র‍্যাগিংয়ের বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়নি; সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বহিষ্কৃত কোনো শিক্ষার্থী আবাসিক হলে তাঁর আবাসিকতাও বাতিল করা হবে এবং তাঁর মা-বাবাকে বিষয়টি জানানো হবে।

উপাচার্য আরও বলেছেন, শাস্তির পরও কোনো শিক্ষার্থী একই ধরনের কর্মকাণ্ডে আবার জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন র‍্যাগিংয়ের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানিয়েছে।

প্রশাসনের এ অবস্থানের পেছনে মূলত নতুন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন নতুন করে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেন, তখন তাঁর জন্য পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে কোনো ধরনের ভয়, অপমান বা চাপ তৈরি হলে তা শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত এবং শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখার অংশ হিসেবে দেখছে প্রশাসন। একই সঙ্গে ৮০ শিক্ষার্থীকে সতর্কবার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভবিষ্যতে তাঁদের আচরণে পরিবর্তন আনার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে সতর্কবার্তা পাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া এবং পরিবারকে জানানোয় বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে বোঝা যায়।

অন্যদিকে চারুকলা অনুষদের একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগেও এক বছরের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ র‍্যাগিংয়ের ঘটনা থেকে পৃথক হলেও একই সিন্ডিকেট সভায় সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। একই সঙ্গে অভিযোগের তদন্তে তথ্য-প্রমাণ যাচাই, অভিযুক্তদের বক্তব্য বিবেচনা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা উপকমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর এখন নজর থাকবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও আবাসিক অবস্থার ওপর এবং সতর্কবার্তা পাওয়া শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে র‍্যাগিং বা অনুরূপ শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ১৫ শিক্ষার্থীর বহিষ্কার এবং ৮০ শিক্ষার্থীকে সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনা নবীন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশাসনের তদন্ত ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত