প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ঠেকাতে একযোগে জেলার ১৮টি থানায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে রাত দেড়টা পর্যন্ত চলা এই অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬২৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় উঠতি বয়সী কিশোর ও তরুণদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ও তথ্য সামনে আসছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বুধবার রাতে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশে জেলার ১৮টি থানায় একই সময়ে অভিযান চালানো হয়। যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কিংবা বখাটেদের উৎপাতের অভিযোগ রয়েছে, সেসব এলাকাকে অভিযানের আওতায় নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তাঁদের কেউ আগে কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, কোনো গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না কিংবা নিছক কোনো স্থানে অবস্থান করছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর যাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলার বিভিন্ন থানায় আটকের সংখ্যায়ও পার্থক্য রয়েছে। কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫ জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬ জন, বুড়িচং থানায় ৫০ জন, মনোহরগঞ্জ থানায় ৪১ জন, দাউদকান্দি থানায় ৫৯ জন এবং লাকসাম থানায় ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য থানায় আটক ব্যক্তিদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ চলেছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন শিক্ষার্থী, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত বা যাচাইয়ে কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো তথ্য পাওয়া যাবে না, তাদের সতর্ক করে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাত থেকেই বিভিন্ন থানার সামনে অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়। বিশেষ করে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা ও সদর দক্ষিণ মডেল থানার সামনে সন্তানদের আটকের খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক ছুটে আসেন। কেউ সন্তানের পরিচয়পত্র নিয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আটকের কারণ জানার চেষ্টা করেন। গভীর রাত পর্যন্ত অনেক অভিভাবককে থানার বাইরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
কোতোয়ালি মডেল থানায় আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনকে নগরের ঈদগাহ মাঠ এলাকা থেকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীও ছিল। ওই শিক্ষার্থীর মা জানান, তাঁর ছেলে সন্ধ্যার পর প্রাইভেট পড়তে বের হয়েছিল। পরে রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি জানতে পারেন, ছেলেকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। এরপর তিনি সন্তানের স্কুলের পরিচয়পত্র নিয়ে থানায় যান।
ওই অভিভাবকের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ জানিয়েছে, ছেলেটি কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলে যাচাই শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ওই মা জানান, তিনি চান না তাঁর সন্তান কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ুক। পুলিশের এমন অভিযানের পাশাপাশি সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়েও অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার আওতাধীন কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর রয়েছে। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, কোটবাড়িতে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে পুলিশ নিয়ে যায়। পরিবারের দাবি, ওই কিশোর কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত নয় এবং সে চলতি বছর এসএসসি পাস করেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, একই এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি নিরপরাধ শিক্ষার্থী বা সাধারণ কিশোরদেরও উপস্থিতি থাকতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর প্রত্যেক আটক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পৃথকভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের সন্তান অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ওই হত্যাকাণ্ডে পুলিশ এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন কিশোর। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। একই সময়ে কুমিল্লা নগর ও আশপাশের এলাকায় কিশোরদের বিভিন্ন দল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
স্থানীয় পর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এসব দলের হালনাগাদ কোনো তালিকা পুলিশের কাছে নেই বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সময়ে নগর এলাকায় একাধিক কিশোর দলের তৎপরতার কথা আলোচনায় এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন নথি ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যেও কয়েকটি দলের নাম উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা দলকে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কুমিল্লায় ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিশোর হওয়ায় গ্রেপ্তারের পর অনেকে দ্রুত জামিন বা মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। অনেকের অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
নতুন করে পরিচালিত এই সমন্বিত অভিযানকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশের চলমান তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর ও তরুণরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালানো হবে।
তবে শুধু অভিযান ও আটকের মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সামাজিকভাবেও আলোচনা রয়েছে। কিশোরদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোরদের অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার, পরিবারে নজরদারি, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ উন্নত করা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কুমিল্লায় রাতভর অভিযানের পর এখন পুলিশের সামনে মূল কাজ হচ্ছে আটক ৬২৪ জনের বিষয়ে সঠিক তথ্য যাচাই করা। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর নিরপরাধ শিক্ষার্থী বা সাধারণ কিশোরদের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যথাযথ যাচাইয়ের ওপরই অভিযানের পরবর্তী ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।