প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে মধ্য ইউরোপের চার দেশের জোট ভিসেগ্রাদ গ্রুপ বা ভি৪-এর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ একাধিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি ভি৪-এর চার দেশের সমর্থনও বৈঠকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো ভারত ও ভিসেগ্রাদ গ্রুপের চার সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘ভি৪+ইন্ডিয়া’ কাঠামোর এই বৈঠকে ভারত ও ইউরোপের মধ্যাঞ্চলের চার দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এটিকে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভিসেগ্রাদ গ্রুপের সদস্য হলো পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন ভি৪-এর সঙ্গে আলাদা একটি সহযোগিতা কাঠামো তৈরি করাকে নয়াদিল্লির ইউরোপকেন্দ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতার আরেকটি দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে ভারত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করতে চাইছে।
বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, যোগাযোগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ লক্ষ্যে ভারত ও ভি৪-এর দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রতিবছর বৈঠকে বসবেন বলে ঐকমত্য হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর একটি ব্যবসায়িক ফোরাম আয়োজনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ভারত ও চার ইউরোপীয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব বাড়ার সময়ে এই ধরনের সহযোগিতা কাঠামো দুই পক্ষের জন্যই নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। ভারত একদিকে ইউরোপের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোও এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিবেশে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে ভি৪+ইন্ডিয়া কাঠামো ভবিষ্যতে শুধু রাজনৈতিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভিসেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশের সঙ্গেই ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গবেষণা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিভিন্ন সম্ভাবনা ভবিষ্যতে আলোচনার অংশ হতে পারে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্বও বেড়েছে। ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের সমন্বয়ের প্রয়োজন তৈরি করেছে। ভারত ও ভি৪ দেশগুলোর আলোচনায় এসব আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও উঠে আসে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মতবিনিময় করেন।
বৈঠকে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানও এই বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভি৪ দেশগুলোর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুরাই ব্লানার বলেন, ভিসেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশই ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করে। তিনি ভারতকে বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি জানিয়ে আসছে। নয়াদিল্লির যুক্তি হলো, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে কাঠামোর ভিত্তিতে পরিষদ গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এলেও সেই কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। এ কারণে নিরাপত্তা পরিষদে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এসব দেশের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে ১০টি অস্থায়ী সদস্য দেশ দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। স্থায়ী সদস্যপদ বাড়াতে হলে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য প্রয়োজন এবং জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হয়। ফলে ভি৪-এর সমর্থন ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন জোগালেও এর মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোতে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন ঘটছে না।
ভারতের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন অবশ্য কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও স্থায়ী সদস্যপদের প্রশ্নে বিভিন্ন দেশের অবস্থান এক নয়। ভারত ছাড়াও জাপান, জার্মানি ও ব্রাজিলসহ কয়েকটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের আলোচনায় রয়েছে। তবে সংস্কারের পদ্ধতি, নতুন সদস্যদের অধিকার এবং ভেটো ক্ষমতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ভি৪+ইন্ডিয়া বৈঠকে ভারতের সঙ্গে মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর সম্পর্ককে একটি নতুন কাঠামোর আওতায় আনার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিবছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংকট নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময়ের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক ফোরাম আয়োজনের ফলে সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।
ভিসেগ্রাদ গ্রুপের ইতিহাসও এই সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালে হাঙ্গেরির ভিসেগ্রাদ শহরে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার নেতাদের বৈঠকের মধ্য দিয়ে জোটটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে জোটে কার্যক্রম চালিয়ে যায়। সোভিয়েত প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় এই সহযোগিতা কাঠামো গড়ে উঠেছিল।
সময়ের সঙ্গে ভি৪-এর সহযোগিতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নীতি ও আঞ্চলিক বিষয়েও প্রভাব ফেলেছে। ভারত এখন এই আঞ্চলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ইউরোপের মধ্যাঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। এর ফলে ভারত-ইউরোপ সম্পর্কের পরিধি পশ্চিম ইউরোপের বড় দেশগুলোর বাইরে মধ্য ইউরোপের দিকেও আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এই সহযোগিতার বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। নিয়মিত কূটনৈতিক বৈঠক ও ব্যবসায়িক ফোরাম চালু হলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নির্দিষ্ট প্রকল্প সামনে আসতে পারে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের আগ্রহকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত প্রথম ভি৪+ইন্ডিয়া বৈঠক ভারত ও মধ্য ইউরোপের চার দেশের সম্পর্ককে নতুন একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। একদিকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি ভি৪ দেশগুলোর সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।