প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজ বৃহস্পতিবার ভাষণ দেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে এটি হবে তাঁর প্রথম ভাষণ। এবারের অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তন, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়নসহ জাতীয় ও বৈশ্বিক নানা বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা নিজ নিজ দেশের অবস্থান, অগ্রাধিকার, সংকট এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের জন্যও এই মঞ্চ দেশের স্বার্থ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের ভাষণে প্রথমবারের মতো বাংলায় বক্তব্য দেবেন বলে জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে মাতৃভাষায় বাংলাদেশের বক্তব্য উপস্থাপনের বিষয়টি এরই মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। ভাষণের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তিনি।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন দেশকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানসহ বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা রয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য খাতগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাংলাদেশের ওপর মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করেছে। সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে আসছে।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আরও জোরদারের চেষ্টা করছেন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় থাকতে পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মানবিক সেবার ওপরও বাড়তি চাপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো উচ্চপর্যায়ের মঞ্চে এই সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি বড় অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জীবিকা সংকটের মতো নানা সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও উঠে আসতে পারে।
যুবসমাজ ও নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও এবারের বক্তব্যে স্থান পাওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একইভাবে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম উপাদান হিসেবে দেখা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সুযোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার সুযোগ তৈরি হয়। এসব বৈঠকের মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ জোরদার করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও এখন আগের তুলনায় বিস্তৃত। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্ব বেড়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবিক সংকট এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার মতো বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা তুলে ধরার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট করার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আজকের ভাষণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। অর্থনীতি ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন—বিভিন্ন জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয় এতে গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এই অধিবেশনকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পরিধি বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। আজকের ভাষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও প্রত্যাশাগুলো কতটা জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়, সেদিকেই থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের নজর।