প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে বিরল এক সৌজন্য প্রদর্শন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে আসা চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে তিনি নিজেই পৌঁছে যান মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ সামরিক বিমানঘাঁটিতে। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত হওয়া সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় শি চিনপিংকে বহনকারী বিমানটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণ করে। বিমান থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট নামার পর বিমানের সিঁড়ির কাছেই উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি শিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দুই দেশের প্রেসিডেন্টের এই সাক্ষাৎকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক একই সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
ওয়াশিংটনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান সফরে এলে সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান। এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রটোকল। তবে এবার সেই প্রচলিত রীতি অনুসরণ না করে ট্রাম্প নিজেই বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত হওয়ায় ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের সাক্ষাৎ হওয়ায় এই আনুষ্ঠানিক সৌজন্যকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প বিদেশি নেতাদের ওয়াশিংটনে বিভিন্ন স্থানে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ের প্রবেশপথে স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি। চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসকেও হোয়াইট হাউসের সাউথ পোর্টিকোতে অভ্যর্থনা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের বিমান অবতরণের স্থানে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানোর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ইতিহাসেও বিমানবন্দরে গিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানানোর ঘটনা খুব ঘন ঘন দেখা যায়নি। ঐতিহাসিকভাবে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬২ সালে ওয়াশিংটনের বিমানবন্দরে গিয়ে আইভরি কোস্টের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স উফুয়ে-বোয়িনিসহ কয়েকজন বিদেশি নেতাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী কয়েক দশকে এ ধরনের রীতি অনেকটাই বিরল হয়ে পড়ে। পোপদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ক্ষেত্রে অবশ্য বিমানঘাঁটিতে প্রেসিডেন্টের উপস্থিতির নজির রয়েছে।
২০০৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও পোপ ফ্রান্সিসকে একই বিমানঘাঁটিতে অভ্যর্থনা জানান। সেই তুলনায় কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
শিকে বিমানঘাঁটিতে স্বাগত জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পারস্পরিক সৌজন্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলির বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গ্রীষ্মে চীনে অনুষ্ঠিত একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনে শি চিনপিং ট্রাম্পকে আন্তরিক আতিথেয়তা দিয়েছিলেন। এবার চীনা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প সেই আতিথেয়তার প্রতিদান দিচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন জনগণের সমৃদ্ধি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে এমন ভালো চুক্তির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের যেকোনো নেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে প্রস্তুত। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনার পথ খোলা রাখার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলোর একটি। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি প্রযুক্তি, সামরিক নিরাপত্তা, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার মতো বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। ফলে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের যেকোনো সরাসরি যোগাযোগ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
বিশেষ করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহৎ দুই অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ওপর বহু দেশের ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থা নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি রপ্তানি এবং শিল্প উৎপাদন নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রভাব দুই দেশের সীমানার বাইরেও পড়তে পারে। এ কারণে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠককে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
প্রযুক্তি খাতও দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত কম্পিউটিং, টেলিযোগাযোগ এবং প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিষয়ে সহযোগিতার প্রয়োজনও রয়েছে। ফলে সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা একই সঙ্গে চলমান।
শির রাষ্ট্রীয় সফর এবং ট্রাম্পের অভ্যর্থনা সেই বৃহত্তর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক সৌজন্যের এই দৃশ্যকে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা নীতিগত সমঝোতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের পরিবেশ তৈরিতে এ ধরনের সৌজন্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জটিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ আলোচনার বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত রাখার একটি মাধ্যম হতে পারে।
জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্পের উপস্থিতি তাই শুধু একটি অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের দৃশ্য হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্কের বিস্তৃত কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে চীনা রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে সফরটির আনুষ্ঠানিক গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে পারস্পরিক আতিথেয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যা দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সৌজন্যমূলক যোগাযোগের গুরুত্ব নির্দেশ করে।
শির সফরকে ঘিরে দুই দেশের আলোচনায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুও গুরুত্ব পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের নাগরিকদের ওপর নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও কূটনৈতিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যেকোনো বৈঠক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ঐতিহ্যগত প্রটোকলের তুলনায় ট্রাম্পের এবারের পদক্ষেপের ব্যতিক্রমী দিকটি স্পষ্ট। হোয়াইট হাউসে অপেক্ষা না করে সামরিক বিমানঘাঁটিতে গিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানানোর এই ঘটনা সাম্প্রতিক দশকের বিরল উদাহরণগুলোর একটি। তবে এর প্রকৃত কূটনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হলে শুধু অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান নয়, সফর চলাকালে দুই দেশের আলোচনার বিষয়বস্তু এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, শি চিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতেই ট্রাম্পের এই বিরল অভ্যর্থনা দুই দেশের সম্পর্ককে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে সৌজন্য ও সরাসরি যোগাযোগ যেমন দৃশ্যমান হয়েছে, তেমনি তাদের সম্পর্কের জটিল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতাও সামনে এসেছে। এখন এই সফরের আলোচনায় বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কী ধরনের অগ্রগতি বা মতপার্থক্য প্রকাশ পায়, সেদিকেই থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের নজর।