মাদক-জুয়া ঠেকাতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
মাদক-জুয়া ঠেকাতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তি ও জুয়ার মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কমিটিতে কারা থাকবেন, সদস্যসংখ্যা কত হবে এবং তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কার্যক্রম কী হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পাঠদানের জায়গা হিসেবে নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। কৈশোর ও তারুণ্যের সময়ে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত সেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তি এবং জুয়ার মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিরাপদ রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে এসব কমিটির মাধ্যমে।

মাদকের অপব্যবহার প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি এর আগেও সরকারি পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের জুনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় মাদকের কুফল সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গঠিত মাদকবিরোধী কমিটির কার্যক্রম আরও গতিশীল ও দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ না করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

নতুন সিদ্ধান্তে মাদকের পাশাপাশি জুয়াকেও একই প্রতিরোধ কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমান সময়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ জুয়ার কার্যক্রম এখন শুধু প্রচলিত স্থান বা সরাসরি লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বেটিংয়ের মতো বিভিন্ন মাধ্যমেও জুয়ার বিস্তার নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চলতি বছর দেশে জুয়া, অনলাইন জুয়া ও অনলাইন বেটিং প্রতিরোধে নতুন আইনও কার্যকর হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের মাধ্যমে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হবে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে কমিটিগুলোর কাঠামো, দায়িত্ব, নিয়মিত কার্যক্রম এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতায় মাদক প্রতিরোধ শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, পরিবারকে যুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী মাদকের ঝুঁকিতে পড়লে তাকে শুধু শাস্তির দৃষ্টিতে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং, পরিবারকে অবহিত করা এবং পুনর্বাসনমূলক সহায়তার সুযোগ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকারি নথিতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদক বিক্রি ও ব্যবহার প্রতিরোধ, নিয়মিত অভিযান এবং মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গঠিত কমিটিগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

এর আগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার নজিরও রয়েছে। কোথাও এসব কমিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, নিয়মিত প্রচার চালানো এবং মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই মাদক ও জুয়ার সমস্যা দূর হবে না। কমিটির নিয়মিত বৈঠক, কার্যক্রমের তদারকি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ থাকে, সে বিষয়েও শিক্ষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, অস্বাভাবিক ব্যয় বা নতুন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো নজরে এলে পরিবারকে সচেতনভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যাই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদক ও জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন। কেবল নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির কথা বলার পরিবর্তে এসব কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা কার্যকর হতে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাই কমিটির কার্যক্রমকে দৃশ্যমান ও নিয়মিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকলে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা মাদক ও জুয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত বিকাশে মনোযোগ দিতে পারে। এখন কমিটিগুলোর কাঠামো ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অগ্রগতি সামনে এলে উদ্যোগটির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।

সবশেষে, মাদক ও জুয়া প্রতিরোধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থী, পরিবার, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গঠিত কমিটিগুলো যদি নিয়মিত সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সমন্বয়মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির সরকারি উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত