মামদানির আমলে প্রথম নিউইয়র্কে নেতানিয়াহু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
মামদানির আমলে প্রথম নিউইয়র্কে নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে নিউইয়র্ক। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম শহরটিতে যাচ্ছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। ফলে তাঁর এবারের সফর কেবল জাতিসংঘে একটি ভাষণ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এবং নিউইয়র্কের মেয়রের সঙ্গে তাঁর তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ—সবকিছু মিলিয়ে সফরটি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতানিয়াহুর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে বৃহস্পতিবার। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর ভাষণে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানিকে সরাসরি আক্রমণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে মামদানি কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুও নিউইয়র্কের মেয়রের অবস্থানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং তাঁকে হামাসের প্রতি সমর্থন দেখানোর অভিযোগ করেছেন। এসব পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে দুজনের বিরোধ এখন আন্তর্জাতিক মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

মামদানি নির্বাচনী প্রচারের সময় বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে তাঁর এককভাবে এমন গ্রেপ্তার কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা নেই। ফলে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর তাঁকে আটক করা হবে—এমন পরিস্থিতির বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে আইনি সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহু তাঁর এবারের সফর নিয়ে আগেই একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, নিউইয়র্কে গিয়ে তিনি ইসরায়েলি সেনাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরবেন এবং মামদানির বিরুদ্ধেও কথা বলবেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হতে পারে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়া।

অন্যদিকে নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর সফরকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েল সরকারের বিরোধী বিভিন্ন সংগঠন এবং ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীরা তাঁর জাতিসংঘে বক্তব্যের সময় ও আশপাশে প্রতিবাদের কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। বুধবার থেকেই জাতিসংঘের আশপাশে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে নেতানিয়াহুর উপস্থিতির সময় নিউইয়র্কে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

তবে এবারের সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো এর অস্বাভাবিক সংক্ষিপ্ত সময়সূচি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে দীর্ঘ সময় অবস্থান করবেন না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পর একই দিন ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সফরটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এমনকি নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে অবতরণ করবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে বিমানটি রাখার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতার আশঙ্কায় নিউজার্সির নিউআর্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অথবা ওই অঙ্গরাজ্যের কোনো সামরিক ঘাঁটিকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে সফরটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক না থাকা। জাতিসংঘের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির মধ্যেও ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কোনো বৈঠক এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। একই সময়ে ট্রাম্প নিউইয়র্কে অবস্থান করলেও তাঁর কর্মসূচিতে অন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুর এবারের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ না হওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং পরবর্তী যুদ্ধবিরতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। নেতানিয়াহু ইরানবিষয়ক যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে নীতিগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা চলছে।

নেতানিয়াহুর জন্য নিউইয়র্ক সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। সামনে দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপ নিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর রাজনৈতিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। গাজা যুদ্ধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে মতভেদ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতানিয়াহুর বক্তব্য দেশের ভোটারদের কাছেও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে পৌঁছাতে পারে।

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জাতিসংঘের ভাষণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি ইসরায়েলের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের রূপ নিতে পারে। তাঁর মতে, মামদানি ও ইরানকে আক্রমণাত্মকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে নেতানিয়াহু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন জোরদারের চেষ্টা করতে পারেন। তবে এটি একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

এদিকে জাতিসংঘের এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, ইয়েমেনের সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা বৈশ্বিক সংকট নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।

এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর ভাষণ আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তিনি গাজা যুদ্ধের পক্ষে ইসরায়েলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন, হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি তুলে ধরতে পারেন এবং ইসরায়েলের সমালোচকদের জবাব দিতে পারেন। একই সঙ্গে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সঙ্গে তাঁর বিরোধও বক্তব্যে জায়গা পেতে পারে বলে রয়টার্সসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের মঞ্চে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বাইরে নিউইয়র্কের রাস্তায় কী ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পাশাপাশি ইসরায়েল ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ইহুদিবিদ্বেষ এবং ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন—এসব বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার এই সফর সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত হলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, মামদানি নিউইয়র্কের মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর নেতানিয়াহুর প্রথম শহর সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তীব্র, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ইসরায়েলের নীতিগত সমন্বয় নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর বক্তব্য তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ নয়; একই সঙ্গে তা নিউইয়র্কের মেয়রের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বিরোধ এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত