কালিয়াকৈরে আগুনে পুড়ল ২৩ বসতঘর ও ৫ দোকান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
কালিয়াকৈরে আগুনে পুড়ল ২৩ বসতঘর ও ৫ দোকান

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুটি কলোনির ২৩টি বসতঘর ও পাঁচটি দোকান পুড়ে গেছে। বৃহস্পতিবার ভোররাতে উপজেলার হরিণহাটি এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যে একের পর এক ঘর ও দোকানে তা ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালাতে হয় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের। তবে শেষ পর্যন্ত আগুনের ভয়াবহতায় বহু পরিবারের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। আগুন লাগার পর অনেক বাসিন্দা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে আসতে পারলেও সঙ্গে করে প্রয়োজনীয় মালামাল বের করার সুযোগ পাননি। ফলে দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পণ্যও আগুনে পুড়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে ঘরবাড়ি ও দোকান হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে এখন অনিশ্চয়তা ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোররাতে হরিণহাটি এলাকার রাসেলের কলোনিতে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। ভোরের নীরব সময়ে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় প্রথম দিকে বিষয়টি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুন একপর্যায়ে আশপাশের কক্ষ ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। কলোনির ঘরগুলো পাশাপাশি থাকায় আগুন দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুনের তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে পাশের আরেকটি কলোনিতেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে মুন্ডল মার্কেট এবং আমিনুল ইসলাম ও রাসেল আহমেদের কলোনিতে বসবাসকারী মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় কেউ কেউ ঘরের ভেতরে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ারও সুযোগ পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে নিজেদের জীবন রক্ষা করাই তখন সবার কাছে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আগুনের প্রথম ধাক্কা সামলাতে স্থানীয় বাসিন্দারাই এগিয়ে আসেন। তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন এবং একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। আগুনের বিস্তার ঠেকাতে ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও সহযোগিতা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে শুরু হওয়া আগুন পরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ততক্ষণে দুটি কলোনির বহু ঘর ও দোকান পুড়ে যায়।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসেল আহমেদ ও আমিনুল ইসলামের মালিকানাধীন কলোনির ঘরগুলো। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, মুন্ডল মার্কেটসংলগ্ন এলাকাতেও আগুনের প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পোড়া ঘর ও দোকানের সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য পাওয়া গেলেও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধৃত তথ্যে ২৩টি ঘর ও পাঁচটি দোকান পুড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কলোনির মালিক রাসেল আহমেদ ঘটনার পর গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর কলোনির ঘরগুলো পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীও নষ্ট হয়েছে। দোকানগুলোর মালামালও আগুন থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই অগ্নিকাণ্ডে শুধু ঘরবাড়ির মালিকরাই নয়, সেখানে বসবাসকারী ভাড়াটিয়া পরিবার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিশেষ করে যেসব পরিবার দিনমজুরি, কারখানার শ্রমিকের কাজ, ছোট ব্যবসা কিংবা অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেশার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য এমন ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। একটি ঘরের ভেতরে থাকা প্রতিটি জিনিস হয়তো আলাদা করে খুব বেশি দামের নয়, কিন্তু একটি পরিবারের জন্য সেগুলোই দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সম্পদ। বিছানা, কাপড়, রান্নার সামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, শিশুদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র হারিয়ে গেলে সেগুলো আবার সংগ্রহ করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে হতে পারে।

প্রথম দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তাদের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা এবং পাশাপাশি থাকা ঘর ও দোকানের কারণে আগুন নেভানোর কাজ সহজ ছিল না। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্রায় দুই ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

অগ্নিকাণ্ডে দুটি কলোনির মোট ২৩টি বসতঘর এবং পাঁচটি দোকান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। এসব ঘরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর অনেকেরই পোশাক, আসবাবপত্র, রান্নার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী পুড়ে গেছে। অন্যদিকে দোকানগুলোতে থাকা বিভিন্ন ধরনের পণ্যও আগুনের হাত থেকে রক্ষা করা যায়নি। ফলে বসতঘর হারানোর পাশাপাশি কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁদের আয়ের প্রধান উৎসও হারিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কলোনির মালিক রাসেল অগ্নিকাণ্ডের পর গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তাঁর কলোনির ঘরগুলো আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। একই সঙ্গে ভাড়াটিয়াদের মূল্যবান আসবাবপত্র এবং দোকানগুলোর মালামালও আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। এতে তিনি নিজে যেমন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি কলোনিতে বসবাসকারী পরিবারগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরায় ঘর তৈরি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে খাদ্যসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানা গেছে। আগুনে সবকিছু হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোর জন্য এমন সহায়তা সাময়িকভাবে হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে।

তবে অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্তদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাঁরা কোথায় থাকবেন এবং কীভাবে আবার নতুন করে জীবন শুরু করবেন। নিম্নআয়ের অনেক পরিবার কলোনির ছোট ঘরগুলোতেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছিলেন। তাঁদের অনেকের সঞ্চয় সীমিত। অগ্নিকাণ্ডে ঘর ও ব্যবহার্য সামগ্রী হারানোর পর নতুন করে ঘর ভাড়া নেওয়া, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কেনা এবং দৈনন্দিন জীবন চালানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে যেসব দোকান পুড়ে গেছে, সেসব ব্যবসার মালিকদের নতুন করে পুঁজি সংগ্রহ করে ব্যবসা শুরু করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন রায়হান চৌধুরী জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে আগুন লেগেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত ও পরবর্তী পর্যালোচনার পর অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

ঘনবসতিপূর্ণ কলোনি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। একাধিক ঘর ও দোকান পাশাপাশি থাকায় একটি স্থানে আগুন লাগলে তা দ্রুত আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভোররাতের মতো সময়ে অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় আগুনের প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করতে দেরি হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। হরিণহাটির এই ঘটনা আবারও আবাসিক কলোনি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অগ্নিকাণ্ডের পর এলাকায় পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কলোনি ও বাজার এলাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নার ব্যবস্থা, গ্যাস বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগ, পানির ব্যবস্থা এবং বাসিন্দাদের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কালিয়াকৈরের হরিণহাটি এলাকায় বৃহস্পতিবারের এই অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের প্রাণহানি না হলেও বহু মানুষের জীবনে এর প্রভাব পড়েছে। কারও মাথা গোঁজার ঠাঁই পুড়েছে, কারও ব্যবসার পুঁজি শেষ হয়েছে, আবার কারও দীর্ঘদিনের ব্যবহার্য সামগ্রী মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা পোড়া ঘর ও দোকানের ধ্বংসাবশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের অসহায় পরিস্থিতিরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ দ্রুত নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত শেষ হলে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত