বৈশ্বিক শান্তিতে বাংলাদেশের পাঁচ দফা প্রস্তাব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার
বৈশ্বিক শান্তিতে বাংলাদেশের পাঁচ দফা প্রস্তাব

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করতে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শান্তি বিনির্মাণ, সংঘাত প্রতিরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সভাটির সভাপতিত্ব করে মরক্কো। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় সংঘাতপ্রবণ ও সংঘাত-পরবর্তী দেশগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, নারী ও যুবসমাজকে শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা এবং শান্তি বিনির্মাণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো।

বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি শান্তি বিনির্মাণ কাঠামো, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা জোরদার করা হবে। বাংলাদেশের মতে, সংঘাত থামিয়ে দেওয়া বা সাময়িকভাবে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বিনির্মাণে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি হতে হবে পরিকল্পিত, পরিস্থিতি-সংবেদনশীল এবং টেকসই।

বাংলাদেশ যে পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ বা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে স্থানীয় মানুষের জন্য বিশেষ করে নারী ও যুবকদের শালীন ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছে বাংলাদেশ। কারণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি অনেক সমাজে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা গেলে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি শান্তি প্রতিষ্ঠার সামাজিক ভিত্তিও আরও মজবুত হতে পারে।

বাংলাদেশের আরেকটি প্রস্তাব শান্তিরক্ষা থেকে শান্তি বিনির্মাণে উত্তরণের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের উপদেষ্টা ভূমিকা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেয়। কোনো দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর সেখানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হলে পুনরায় অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ মনে করে, এই উত্তরণকে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। প্রতিটি দেশের স্থানীয় বাস্তবতা, সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি-সংবেদনশীল পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। শান্তিরক্ষা থেকে শান্তি বিনির্মাণে যাওয়ার এই পর্যায়ে শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারী ও যুবকদের অংশগ্রহণকেও বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ এবং ‘যুব, শান্তি ও নিরাপত্তা’ এজেন্ডাকে শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমের মূলধারায় নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। আর নারী ও তরুণরা অনেক সময় সংঘাতের কারণে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ হারান। একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর সমাজ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের কেবল সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের শান্তি বিনির্মাণ স্থাপত্য পর্যালোচনার কার্যকর ও সময়োপযোগী বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। শান্তি বিনির্মাণের বৈশ্বিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কার ও পর্যালোচনা করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বক্তব্যে তাই নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শান্তি বিনির্মাণের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অর্থায়নের বিষয়টি সামনে এনেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত, অনুমানযোগ্য এবং টেকসই অর্থায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সংঘাত-পরবর্তী দেশে স্বল্পমেয়াদি সহায়তা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি দেখা দেয়। এতে শান্তি বিনির্মাণের উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতা পায় না। বাংলাদেশের মতে, কার্যকর শান্তি বিনির্মাণ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গত দুই দশকের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সম্প্রদায়, জাতীয় সরকার এবং জাতিসংঘ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে সহিংসতা প্রতিরোধ ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে, তার অনুপ্রেরণাদায়ী বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শান্তি বিনির্মাণ কমিশন আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মত দেন।

বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে স্থানীয় মালিকানা ও জাতীয় নেতৃত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি বিনির্মাণের কোনো উদ্যোগ কেবল আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হলে তার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। স্থানীয় জনগণ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে এর গ্রহণযোগ্যতাও শক্তিশালী হতে পারে।

‘জাতীয় মালিকানা অনুশীলনে: আন্তর্জাতিক শান্তি নির্মাণ সহায়তার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি বৃদ্ধি’ শীর্ষক সভায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সভার আলোচনার মূল ভাবনার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আসছে। ফলে শান্তিরক্ষা ও সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শান্তি বিনির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব বহন করে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, সংঘাতের পর মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা, প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক বিভাজনের কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠা একটি জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের পাঁচ প্রস্তাবে কর্মসংস্থান, নারী ও যুবকদের অংশগ্রহণ, শান্তিরক্ষা থেকে শান্তি বিনির্মাণে পরিকল্পিত উত্তরণ, নীতিগত পর্যালোচনার বাস্তবায়ন এবং টেকসই অর্থায়নের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের বক্তব্যে মূলত শান্তিকে শুধু সংঘাতের অনুপস্থিতি হিসেবে না দেখে মানুষের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুযোগসমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা, তরুণ ও নারীদের সম্পৃক্ত করা এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার মাধ্যমে শান্তির সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্কের এই মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো বৈশ্বিক শান্তি বিনির্মাণের বৃহত্তর আলোচনায় দেশটির অগ্রাধিকার ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জাতীয় মালিকানা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সংঘাত-পরবর্তী সমাজগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ আরও কার্যকর করা সম্ভব—এমন বার্তাই বাংলাদেশের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত