প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুদ্ধ, সামরিক হামলা, নিষেধাজ্ঞা এবং গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নিউইয়র্ক সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ মনোযোগ তৈরি করেছে। কয়েক মাস আগেও যাঁদের নিরাপত্তার জন্য দেশের ভেতরে শেল্টারে আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল, তাঁরাই এবার যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন। শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তেহরান তার কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বদলে যায়। ওই হামলায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন। যুদ্ধের সেই পরিস্থিতি থেকে কয়েক মাস পর তাঁদের নিউইয়র্ক সফর তাই শুধু জাতিসংঘের একটি নিয়মিত কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ইরানের জন্য এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ধরে রাখার একটি সুযোগে পরিণত হয়েছে।
ইরানি নেতৃত্বের নিউইয়র্ক সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিকদের সঙ্গে আরাগচির ধারাবাহিক বৈঠক। তিনি দুই ডজনেরও বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ইউরোপের একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। এমনকি জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকগুলোর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে, কারণ জর্ডানও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আরাগচির সরাসরি বৈঠক। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি আলোচনা কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বৈঠকের সব বিস্তারিত প্রকাশ্যে না এলেও ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে একটি নতুন প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এই যোগাযোগের তাৎপর্য আরও বেড়েছে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে। ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধ এবং নৌ অবরোধের মতো পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। জ্বালানি, বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনো মাথা নত করবে না। তাঁর এই বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে ইরানের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী অংশের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন এবং যুদ্ধের মধ্যে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে এনেছেন।
পেজেশকিয়ানের সফরের আগে ইরানের অভ্যন্তরে অবশ্য সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নিয়ে রক্ষণশীল রাজনীতিকদের একটি অংশ আপত্তি তুলেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, যে দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, সেই দেশেই গিয়ে আলোচনা করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আরাগচি যখন মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠক করেন, তখন ইরানের কিছু রক্ষণশীল আইনপ্রণেতার পক্ষ থেকেও সমালোচনা আসে।
কিন্তু ইরানি নেতৃত্ব সেই ঝুঁকি নিয়েই নিউইয়র্ক সফর সম্পন্ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তেহরান একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিতে চেয়েছে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। প্রথমত, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও কূটনৈতিক কার্যক্রম সচল রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সামরিক সংঘাত চললেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইরানের জন্য জাতিসংঘের মঞ্চ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তেহরান তার বক্তব্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পায়। এ বছর সেই সুযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ ইরান সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত এবং আন্তর্জাতিক শ্রোতা—দুই পক্ষকেই লক্ষ্য করে দেওয়া রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে নিউইয়র্কে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশটির পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ। পেজেশকিয়ান একটি হোটেলে পশ্চিমা সাংবাদিক ও থিংক-ট্যাংক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। সেখানে তাঁর সরকারের চিন্তাভাবনা ও অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়। যুদ্ধের সময়ে আন্তর্জাতিক জনমতকে প্রভাবিত করা এবং নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
তবে ইরানের এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে কেবল সাফল্য হিসেবে দেখার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরাসরি বৈঠক হওয়া মানেই যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের সমঝোতা তৈরি হয়েছে, এমনটি বলা যায় না। দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইসরায়েল এবং সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। এসব প্রশ্নের সমাধানে দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও নিউইয়র্কে দৃশ্যমান হয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের অধিবেশনেও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি দল তাঁর বক্তব্যের সময় বেরিয়ে যায়। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে গভীর মতপার্থক্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়েছে।
ইরানি নেতৃত্বের জন্য এই পরিস্থিতি কূটনৈতিকভাবে একটি ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করেছে। তেহরান তার বক্তব্যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরে থাকে। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চটি দুই পক্ষের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সামরিক সংঘাতের মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগের একটি পথ খোলা রয়েছে। আরাগচি ও উইটকফের বৈঠক সেই সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ কিংবা বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত থাকা অন্তত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বন্ধ হতে দেয়নি।
ইরানের অভ্যন্তরেও এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে দেশটির জনগণ অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। একই সময়ে সরকারকে কট্টরপন্থী অংশের চাপও সামলাতে হচ্ছে। তাই পেজেশকিয়ানের আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃঢ় অবস্থান এবং আরাগচির পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ—দুই ধরনের কৌশল একই সঙ্গে অনুসরণ করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক সফর ইরানের জন্য কতটা কার্যকর হলো, তা নির্ভর করবে সফরের পরবর্তী ফলাফলের ওপর। কূটনৈতিক বৈঠকগুলো বাস্তব আলোচনায় রূপ নেয় কি না, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়মিত হয় কি না এবং যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোনো অগ্রগতি তৈরি হয় কি না—এসবই নির্ধারণ করবে এই সফরের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও ইরান তার কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। শেল্টার থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে উঠে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা এবং একই সময়ে প্রতিপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনায় বসা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই তেহরানের বর্তমান কূটনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের ময়দানে যে সংঘাতের দ্রুত সমাধান হয়নি, সেটি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কতটা এগোয়, এখন সেই প্রশ্নের দিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।