প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারত ও নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬ জন। আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি বাড়িঘর। অন্যদিকে নেপালে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ১১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় দেশটির ৭৭ জেলার মধ্যে ৪৯টিতে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশে কয়েক দিন ধরে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। সড়ক ও বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উত্তর প্রদেশে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ৬৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ওই সময়ে রাজ্যটিতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। অতিবৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো আবহাওয়া যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটেছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে। পানিতে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও ফসলের পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পানি দ্রুত নামতে না পারলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের পর্যবেক্ষণেও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেশটির সাতটি রাজ্যের ৩০টি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে গুরুতর পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গঙ্গা, গণ্ডক, কোসি, বাগমতী ও নর্মদাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীগুলোর পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী নেপালেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির প্রধান নদী ও উপনদীগুলোর পানি ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে ৭৭ জেলার মধ্যে ৪৯টিতে পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির অর্ধেকের বেশি জেলা বর্তমানে বন্যা কিংবা পাহাড়ি ঢলের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে নদী ও পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অতীতে বড় ধরনের বন্যা বা ভূমিধস হয়েছে, সেসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। কারণ পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে বড় ধরনের ঢলের সৃষ্টি হতে পারে।
গত মাসের ভয়াবহ দুর্যোগের ক্ষত এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি নেপাল। রাশুয়া ও নুওয়াকোটসহ কয়েকটি এলাকা এর আগে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই দুর্যোগে এক হাজার ৪৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নতুন করে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও বর্তমানে রাশুয়া ও নুওয়াকোটকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, তবু কর্তৃপক্ষ সেখানে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ি জেলায় দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাতেও। মানাং, মুস্তাং, মিয়াগদি ও বাগলুং জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করে সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় অনেক জায়গায় উদ্ধার ও মেরামতকাজে সময় লাগছে।
রাহুগঙ্গা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় একটি ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একটি টাওয়ারও ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অবকাঠামোগত কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসের পাশাপাশি নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অপটিক্যাল ফাইবার ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর মধ্যেই নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় মানাং জেলায় আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতার হিমলুং হিমাল এলাকায় তুষারধসে একটি বেজক্যাম্প চাপা পড়েছে। সেখানে বিদেশি পর্বতারোহীদের জন্য তাঁবু স্থাপনের কাজে নিয়োজিত স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যে ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তুষারধসের সময় সেখানে কোনো বিদেশি পর্বতারোহী উপস্থিত ছিলেন না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পরপর বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটির অনেক এলাকায় দুর্যোগের পর দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের উদ্ধার এবং বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে খাবার ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পানিতে আটকে থাকা মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির হিসাব করা এবং কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি নদীগুলোর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নতুন করে আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি শুধু মানুষের জীবনেই আঘাত হানে না, এর প্রভাব পড়ে পরিবার, কৃষি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে। ঘরবাড়ি হারানো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাও জরুরি হয়ে পড়ে। ভারত ও নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই মানবিক চ্যালেঞ্জই এখন সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, নদীর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত পুনর্নির্মাণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
দুই দেশে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৭০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন করে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকায় ভারত ও নেপালের বহু মানুষ এখন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত