প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধনশীল যুদ্ধাবস্থা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মাঝে এবার সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে হামলাকারীরা। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ দাম্মামে অবস্থিত বিখ্যাত কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় একজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বুধবার সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ হামালা ও হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের কৌশলগত অবকাঠামো, তেলক্ষেত্র এবং বেসামরিক বিমানবন্দরে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, দাম্মাম বিমানবন্দরে আঘাত হানা এই হামলায় আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের আঘাত অত্যন্ত গুরুতর। ঘটনার পরপরই বিমানবন্দর এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয় এবং রক্তাক্ত আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং নিরাপত্তা জোরদার করে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানরত শত শত দেশি-বিদেশি যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য বিমান চলাচল ব্যাহত হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর খবরে জানা গেছে, এই একই দিনে সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শাইবাহ তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনায় হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসা একটি শত্রুপক্ষীয় ড্রোন সফলতা ও দক্ষতার সাথে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করেছে সৌদি সামরিক বাহিনী। তবে সেই ড্রোনটি ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় বা তার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত সম্প্রতি নতুন ও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, সরকারি দপ্তর ও বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে এই ধরণের ধারাবাহিক হামলার তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগেও সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন শহরের বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ১১ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি দূরপাল্লার প্রজেক্টাইলের আঘাতে একজন প্রাণ হারান এবং অন্তত ১১ জন আহত হন। এর ঠিক আগের দিন ১০ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অপর এক ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছিল দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। একের পর এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বা অসতর্কভাবে চালানো এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথি বাহিনীর পক্ষ থেকে একের পর এক আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের অ-জরুরি কর্মীবৃন্দ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। মধ্যপ্রাচ্যের চরম সংকটজনক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল সৌদি আরবই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বন্ধুপ্রতিম দেশে অবস্থিত মার্কিন মিশন থেকেও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা স্বার্থে সরিয়ে নেওয়ার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে ইতিমধ্যে একটি বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত জরুরি সরকারি বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, দাম্মাম বিমানবন্দরে আঘাত হানা এই বিধ্বংসী হামলায় আহত আটজনের মধ্যে বেশ কয়েকজনের আঘাত অত্যন্ত মারাত্মক ও সংকটাপন্ন। ঘটনার পরপরই বিমানবন্দর জুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং উদ্ধারকারী দল রক্তাক্ত আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ উন্নত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। একই সময়ে বিমানবন্দরে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী এবং বিশেষ কমান্ডো দল পুরো বিমানবন্দর এলাকা ঘেরাও করে ফেলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে। দিনের ব্যস্ততম সময়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক হামলার ফলে কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানরত শত শত দেশি-বিদেশি যাত্রী, পর্যটক ও বিমান কর্মচারীদের মধ্যে এক চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। চতুর্দিকে হুড়োহুড়ি আর কান্নার রোল পড়ে যায়। ঘটনার কারণে বেশ কিছুক্ষণ সময় বিমান উঠানামা ও টার্মিনালের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনে ফ্লাইট পরিচালনা পুনরারম্ভ করা হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার ঠিক একই দিনে সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল শাইবাহ তেলক্ষেত্রের একটি বৃহৎ স্থাপনায় হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসা অন্তত একটি শত্রুপক্ষীয় ড্রোন সফলতার সাথে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝআকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে সৌদি সামরিক বাহিনী। তবে সেই ড্রোনটি সামরিক বাহিনীর আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তার জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে থাকা তেলক্ষেত্রের শ্রমিকদের আবাসন ও কাজের এলাকার ওপর এসে পড়লে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন বলে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ সূত্রের বরাতে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী হুথি বাহিনী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নতুন করে এক অতি-উত্তপ্ত ও সর্বাত্মক রূপ ধারণ করায় সম্প্রতি সৌদি ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রাণকেন্দ্রগুলোতে এই ধরণের বিধ্বংসী আক্রমণের হার মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত কয়েক সপ্তাহেও সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন প্রধান প্রধান শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১১ অক্টোবর রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত সুরক্ষিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি দূরপাল্লার প্রজেক্টাইলের সরাসরি আঘাতে একজন ব্যক্তি নিহত হন এবং অন্তত ১১ জন গুরুতর আঘাত পান। এর ঠিক এক দিন আগে, ১০ অক্টোবর একই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অপর এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন হামলায় মোট ১২ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। একের পর এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসামরিক যাত্রী ও বিমান চলাচলের রুটকে লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পুরো আকাশপথকে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিরাপদ করে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতকে বড় ধরণের ধসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সৌদি আরবের বর্তমান ভঙ্গুর ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে চলায় বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। হুথি বাহিনীর পক্ষ থেকে সামনের দিনগুলোতে আরও বড় আকারের ও সমন্বিত প্রতিশোধমূলক হামলার জোরালো আশঙ্কায় সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের অ-জরুরি কর্মীবৃন্দ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে কিংবা স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, কেবল সৌদি আরবই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মিত্র দেশগুলোতে অবস্থানরত আমেরিকান মিশনগুলো থেকেও মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সরিয়ে নেওয়ার একটি সমন্বিত সামরিক ও কূটনৈতিক জরুরি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে ইতিমধ্যে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজস্ব নাগরিক ও কূটনৈতিক কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে এবং অপ্রয়োজনীয় সকল অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ এড়িয়ে চলার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
সৌদি আরবের মতো তেলসমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী দেশে বেসামরিক স্থাপনায় এমন তাণ্ডব আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও এক ধরনের অনিশ্চয়তার কালো ছায়া ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো এবং জাতিসংঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে সংঘাতের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দাম্মাম বিমানবন্দরের এই হামলা কেবল সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়নি, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত