প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমানা ঘেঁষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উপজেলা জৈন্তাপুর ও পর্যটন সমৃদ্ধ পরিবেশবেষ্টিত জাফলং অঞ্চলে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এক নজিরবিহীন বিদ্যুৎহীন স্থবিরতা নেমে এসেছে। মূলত চলমান সড়ক উন্নয়ন, রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জরুরি মেরামত কাজের স্বার্থে সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত টানা নয় ঘণ্টার জন্য সকল ধরণের বিদ্যুৎ সংযোগ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) জৈন্তাপুর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এক গণবিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে গত বুধবারই এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল, যেন স্থানীয় বাসিন্দারা আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন।
প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও বিদ্যুৎ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত এই সাময়িক সংযোগ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জৈন্তাপুর প্রধান উপকেন্দ্রের অধীনস্থ কয়েকটি বিশেষ ফিডারে। নির্দিষ্টভাবে জাফলং ১১ কেভি তামাবিল ফিডার, বাণিজ্যিক এলাকা সংলগ্ন চাংগিল ফিডার এবং সামগ্রিক জাফলং এলাকার মূল ফিডারের সকল গ্রাহক আজ ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা এই বিভ্রাটের আওতায় রয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাবে সাধারণ বাসাবাড়ির ফ্রিজ, পানির পাম্পসহ গৃহস্থালি প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ার পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ছোট-বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তীব্র স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্ম পরিকল্পনা ও কারিগরি দিক তুলে ধরে জৈন্তাপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক প্রকৌশলী শাহেদুর রহমান জানান, জৈন্তাপুর-তামাবিল জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোর সম্প্রসারণ এবং মানোন্নয়ন কাজ এখন পূর্ণ উদ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই কাজের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য মূল সড়কের আশপাশে বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু ঝুঁকিপূর্ণ খুঁটিসমূহ নিরাপদে স্থানান্তরিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। একই সাথে ঝুলন্ত পরিবাহী তারের সঠিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ, দুর্বল ট্রানজিটর মেরামত এবং প্রধান উপকেন্দ্রের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনেই মূলত পুরো ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রেখে কাজ সম্পাদন করতে হচ্ছে। নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করে এই বিশাল পরিসরের কাজ শেষ করতে অন্তত টানা ৯ ঘণ্টার প্রয়োজন দেখা দেয়।
বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সীমান্তবর্তী এই জনপদের দৈনন্দিন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে তামাবিল স্থলবন্দর সংলগ্ন কাস্টমস ও ট্রানজিট পয়েন্ট, জাফলং ও চাংগিল এলাকার ক্রাসার মিল, পাথর কোয়ারি নির্ভর খুচরা কারখানা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ একেবারেই থমকে গেছে। সকাল থেকে বাসা-বাড়িতে পানির সংকট যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি সীমান্তবর্তী হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে আগত হাজারও ভ্রমণপিপাসু পর্যটক ও স্থানীয় গ্রাহকরা অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিভ্রাটে ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছেন। তীব্র গরম না থাকলেও দিনের কাজের পিক-আওয়ারে টানা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে বাধ্য হওয়ায় মানুষের সার্বিক স্বাচ্ছন্দ্যে ছেদ পড়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত টানা নয় ঘণ্টা জৈন্তাপুর উপকেন্দ্রের আওতাধীন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফিডারে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে বহুল পরিচিত জাফলং ১১ কেভি তামাবিল ফিডার, চাংগিল ফিডার এবং মূল জাফলং ফিডার। ফলে এই পুরো এলাকার বসতবাড়ি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হচ্ছে।
জৈন্তাপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থার আবাসিক প্রকৌশলী শাহেদুর রহমান জানান, সড়ক প্রশস্তকরণ ও সামগ্রিক মানোন্নয়ন কাজের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। সড়কের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তর, পরিবাহী তারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং উপকেন্দ্রের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি আশ্বাস প্রদান করে বলেন, নির্ধারিত মেরামত ও উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হওয়া মাত্রই কোনো বিলম্ব ছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে।
সকালের সূর্য ওঠার পর থেকেই বিদ্যুৎ না থাকায় এলাকার গৃহিণীদের রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি কাজে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী বাণিজ্য কেন্দ্র জাফলং ও তামাবিল এলাকার পাথর ব্যবসায়ী, মিল মালিক এবং কম্পিউটারনির্ভর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজকর্ম থমকে গেছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকরাও কিছুটা বিপাকে পড়েছেন। তবে সরকারের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সুফলের কথা বিবেচনা করে অনেকেই এই কষ্ট মেনে নিচ্ছেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গ্রাহকদের যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এলাকার মানুষের নিরাপদ যাত্রা এবং ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতেই এই সাময়িক কষ্ট স্বীকার করতে হচ্ছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, নির্দিষ্ট সময়সীমা অর্থাৎ বিকেল পাঁচটার মধ্যেই সব ধরনের কাজ শেষ করে কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করবেন এবং এলাকার জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবেন।
সাময়িক এই নাগরিক দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। বিউবো জৈন্তাপুর দপ্তরের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, কারিগরি কর্মীবাহিনী সকাল আটটা থেকেই জোরকদমে তাদের পূর্বনির্ধারিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়সীমার পূর্বেই যদি খুঁটি স্থাপন ও বৈদ্যুতিক লাইনের কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়, তবে অবিলম্বে মূল সংযোগ চালু করে দেওয়া হবে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ অধিবাসীরা সাময়িক এই দীর্ঘ ভোগান্তি সত্ত্বেও ভবিষ্যতের উন্নত সড়ক অবকাঠামো এবং একটি নিরাপদ ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্বার্থে কর্তৃপক্ষের এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ধৈর্য ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিবেচনা করছেন। বিকেলের পর পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এই অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত