প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা, ইএ-৩-এর শেষকৃত্য নিজ জেলা রাঙামাটিতে যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি ও স্থানীয় প্রথা অনুসরণ করে তাঁর শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই নৌসদস্যের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দূর দেশের মাটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ট্রোম্যান খীসার মরদেহ যখন নিজ গ্রামে পৌঁছায়, তখন স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের আবহ। একজন সামরিক সদস্য হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। তাঁর শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় সামরিক মর্যাদা ও ধর্মীয় রীতির সমন্বয় ঘটেছে। উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা।
জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে মোতায়েন বাংলাদেশ ফরমড মিলিটারি ইউনিট-১১ বা ব্যানএফএমইউ-১১-এ দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন ট্রোম্যান খীসা। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। কর্তব্যরত অবস্থায় তাঁর এই মৃত্যুতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও শান্তিরক্ষা মিশনের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ ও সংকটাপন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের সামরিক সদস্যরা শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা রক্ষা এবং মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকেন। ট্রোম্যান খীসাও সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবে দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মৃত্যু শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশি সদস্যদের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে।
ট্রোম্যান খীসার প্রতি জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে বিশেষ প্রতিনিধি এবং দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান এই নৌসদস্যের অবদানকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এতে বোঝা যায়, দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবার বা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য নয়, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত একটি বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
রোববার সকালে ট্রোম্যান খীসার মরদেহ ঢাকার বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় রাঙামাটি জেলার পৈতৃক নিবাসে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসেন তিনি, তবে জীবিত অবস্থায় নয়। যে মানুষটি দেশের দায়িত্ব পালনের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়েছিলেন, তাঁর শেষ যাত্রা শেষ হয় নিজের গ্রাম রামহরিপাড়ায়।
সোমবার সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি ও প্রথা অনুযায়ী শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে ধর্মীয় প্রার্থনা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষ, সহকর্মী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই শেষ বিদায়ের সাক্ষী হন।
শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতার পর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ট্রোম্যান খীসাকে সামরিক সম্মান জানানো হয়। গার্ড অব অনারের মাধ্যমে তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। একজন নৌসদস্য হিসেবে দেশের সেবায় তাঁর অবদানকে স্মরণ করে সহকর্মী ও কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা জানান।
এই সময় ট্রোম্যান খীসার স্ত্রীর হাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও জাতিসংঘের পতাকা, ক্যাপ এবং মেডেল তুলে দেওয়া হয়। সামরিক জীবনে একজন সদস্যের দায়িত্ব, ত্যাগ ও অবদানের প্রতীক হিসেবে এসব সামগ্রী তাঁর পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়। স্বজনদের জন্য এটি যেমন ছিল গভীর বেদনার মুহূর্ত, তেমনি প্রিয় মানুষটির দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিও বহন করেছে।
ট্রোম্যান খীসার মৃত্যুতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। একজন সামরিক সদস্যের কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার একটি হলো দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন হারানোর ঝুঁকি। ট্রোম্যান খীসার ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেই নির্মম পরিণতি নেমে এসেছে।
ট্রোম্যান খীসার পারিবারিক ও কর্মজীবনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি ১৯৮৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার রামহরিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে নাবিক হিসেবে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ সামরিক জীবনে দায়িত্ব পালনের পর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত হন। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে দক্ষিণ সুদানের মাটিতে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এসব মিশনে দায়িত্ব পালনের সময় সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সংঘাত, দুর্ঘটনা, প্রতিকূল পরিবেশ কিংবা বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবকিছুর মধ্যেই তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ট্রোম্যান খীসার মৃত্যু সেই দায়িত্বের ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার একটি উদাহরণ হয়ে রইল।
তাঁর নিজ গ্রামে শেষ বিদায়ের দৃশ্য ছিল আবেগঘন। পরিবার হারিয়েছে একজন প্রিয় মানুষকে, সহকর্মীরা হারিয়েছেন একজন সহযোদ্ধাকে এবং নৌবাহিনী হারিয়েছে দায়িত্বশীল এক সদস্যকে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁর স্মৃতি পরিবার ও সহকর্মীদের কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে।
একজন নৌসদস্য হিসেবে ট্রোম্যান খীসার জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়েছে দেশের সীমানার বাইরে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। কিন্তু তাঁর শেষ বিদায় হয়েছে নিজের জন্মভূমির মাটিতে, পরিবারের মানুষ ও আপনজনদের উপস্থিতিতে। সামরিক মর্যাদা, জাতিসংঘের স্বীকৃতি এবং স্বজনদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তাঁর পার্থিব যাত্রা।
ট্রোম্যান খীসার এই আত্মত্যাগ তাঁর পরিবারের জন্য যে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। তবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর মৃত্যু এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাঁর অবদান সহকর্মী ও দেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাঙামাটির নিজ গ্রামে সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই সদস্য ফিরে গেলেন তাঁর চিরচেনা মাটিতে, রেখে গেলেন দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।