প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ডের কাছে গ্রেপ্তার পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে কঠোর শর্তে জামিনে মুক্তি দিয়েছে দেশটির পুলিশ। বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে জামিনে মুক্তি পেলেও পাঁচজনই পুলিশের তদন্তের আওতায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পুলিশ।
ঘটনাটি ঘিরে যুক্তরাজ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় সেখানে সন্দেহজনক তৎপরতার খবরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা বিষয়টির পেছনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, তাদের হয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি শক্তিকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়নি।
যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পুলিশের প্রধান লরেন্স টেলর জানিয়েছেন, পাঁচ সন্দেহভাজনকে কঠোর শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে। তাঁদের চলাফেরা ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, জামিনে মুক্তি পাওয়ার অর্থ তদন্ত শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রোববার ভোররাতে ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির আশপাশে কয়েকটি সন্দেহজনক যানবাহনের গতিবিধি সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। পরে সশস্ত্র পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিমানঘাঁটির কাছাকাছি উইলফোর্ড এলাকায় পাঁচজনকে আটক করে। তাঁরা তিনটি যানবাহনে করে ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক-সংক্রান্ত আইনের অধীনে সন্দেহ করা হয়। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। ঘটনাস্থলে থাকা তিনটি যানবাহনও ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এ কাজে সামরিক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়। তদন্তকারীরা যানবাহনগুলোর সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন।
গ্রেপ্তার পাঁচজনই ব্রিটিশ নাগরিক এবং তাঁদের বয়স ২০-এর কোঠায়। তাঁরা লন্ডনের বাসিন্দা বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় বা ব্যক্তিগত পটভূমি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্ত চলমান থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়েও পুলিশ এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
ঘটনার পর ফেয়ারফোর্ডের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশের একটি বড় দল এলাকায় অবস্থান নেয় এবং বিমানঘাঁটির আশপাশে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থানীয় একটি এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় ৮৫টি পরিবারকে সাময়িকভাবে নিজ নিজ বাড়ি থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর তাঁদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পুরো অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইউরোপে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটেও ঘাঁটিটির ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এ কারণে ঘাঁটির আশপাশে যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতা ব্রিটিশ ও মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ঘটনার সঙ্গে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের যোগাযোগ ছিল কি না। ব্রিটিশ সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা সব সম্ভাবনাই খোলা রাখছেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে কাজ করেছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনের সঙ্গে ইরান, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনাটি ইরানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এমন আলোচনা তৈরি হলেও লন্ডনে ইরানের দূতাবাস তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের বক্তব্য, পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে ইরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। ইরানি পক্ষ আরও বলেছে, এ ধরনের অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাজ্যে ইরানবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘটনাটির সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। সন্দেহভাজনদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তদন্তের স্বার্থে কোনো সম্ভাব্য উদ্দেশ্য বা বিদেশি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলো বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে থাকতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার আগে প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। এই কারণেই ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটিতেও তদন্তকারীরা একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে কাজ করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ঘটনাটি ছিল আকস্মিক ও উদ্বেগজনক। একটি শান্ত গ্রামীণ এলাকার কাছে রাতের বেলায় সন্দেহজনক যানবাহন, সশস্ত্র পুলিশের উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সাময়িক প্রভাব পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় বাসিন্দাদের বাড়িতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার জন্যও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো ওই পাঁচ ব্যক্তি কেন ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছাকাছি গিয়েছিলেন, তাঁদের ব্যবহৃত যানবাহনের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বা বিস্ফোরক-সংক্রান্ত অপরাধের বাস্তব সম্পর্ক ছিল কি না, তা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে কোনো সংগঠন বা বিদেশি শক্তির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাঁচজনকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় তদন্তের গুরুত্ব কমেনি। বরং পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলবে এবং নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করলে বা নতুন কোনো প্রমাণ সামনে এলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ফলে ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাটি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য বা অপরাধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন-ব্যবহৃত বিমানঘাঁটির কাছাকাছি এমন তৎপরতা কীভাবে ঘটল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে তদন্তকারীদের আরও সময় প্রয়োজন। আপাতত পাঁচ সন্দেহভাজন জামিনে থাকলেও তাঁদের ঘিরে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।