প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আগামী ৫ নভেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছেন। মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারিত থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময়ের প্রয়োজনের কথা জানান। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। সালমান শাহর পক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে আলোচিত এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সালমান শাহর পরিবার, ভক্ত এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। চলচ্চিত্রে অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অভিনেতার মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল, সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও মতপার্থক্য রয়েছে। আদালতের সর্বশেষ কার্যক্রম সেই পুরোনো প্রশ্নের বিচারিক নিষ্পত্তির পথকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। সে সময় তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছেলের মৃত্যুকে ঘিরে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তী সময়ে এটিকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের দাবি জানান।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি আদালতে আবেদন করে অপমৃত্যুর মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং ঘটনার তদন্ত করার অনুরোধ করেন। আদালতের নির্দেশে অপমৃত্যুর মামলা ও হত্যার অভিযোগ—দুই বিষয় একসঙ্গে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি।
এরপর ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সিআইডির সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। তবে সালমান শাহর পরিবার ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তার বাবা সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলাটির বিচারিক ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় একাধিক পরিবর্তন আসে। সর্বশেষ মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের পথ তৈরি হওয়ার পর নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তার মরদেহের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের বিষয়টিও সামনে আসে।
চলতি বছরের ২০ মে তদন্ত কর্মকর্তা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ মে আদালত মরদেহ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেন। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ থেকে মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিলের আবেদন করা হয়। আদালত সেই আবেদন নথিভুক্ত করেন।
পরবর্তী সময়ে ২২ জুন সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের লক্ষ্যে কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেটির অনুলিপি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে বর্তমানে যে হত্যা মামলা চলছে, সেটিতে তার স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার বাদী হিসেবে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রয়েছেন। সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে সামীরা হক ছাড়াও শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদের নাম রয়েছে। মামলায় আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মামলার অভিযোগে সালমান শাহর মৃত্যুর দিনের ঘটনাপ্রবাহেরও বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর পরিবারের সদস্যরা নিউ ইস্কাটনের বাসায় তার সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমিয়ে আছেন। কিছু সময় পর তার প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের শারীরিক অবস্থার কথা জানান। এরপর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে তাকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সালমানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার শরীরে কিছু চিহ্ন পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে তাকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর ঘটনাটি তখন থেকেই পরিবার ও ভক্তদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তবে সালমান শাহর মৃত্যুর কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। একদিকে আগের সিআইডি তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল, অন্যদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ ও সন্দেহের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান হত্যা মামলার তদন্তে এসব পুরোনো নথি, সাক্ষ্য, অভিযোগ এবং নতুন করে সংগৃহীত তথ্য কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আদালতের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৫ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। ওই দিন তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন কি না, কিংবা আরও সময়ের প্রয়োজন হবে কি না, তা তখনই স্পষ্ট হবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তাই সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা একজন তরুণ অভিনেতার আকস্মিক মৃত্যু আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে গভীর আবেগের বিষয়। তার অভিনয়জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি দর্শকদের মনে যে জায়গা তৈরি করেছিলেন, তা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। মৃত্যুর এত বছর পরও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা থামেনি। ফলে মামলার তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমের প্রতিটি নতুন অগ্রগতি তার পরিবার ও ভক্তদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
এখন নজর আগামী ৫ নভেম্বরের দিকে। সেদিন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হলে মামলার তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্তে কী ধরনের তথ্য উঠে এসেছে, সে বিষয়ে আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘদিনের এই রহস্যের বিচারিক সমাধানের ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রমাণের মূল্যায়ন।