আইওয়ায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ইস্পাত কারখানা ট্রাম্পের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
আইওয়ায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ইস্পাত কারখানা ট্রাম্পের

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইওয়া অঙ্গরাজ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল ইস্পাত কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই স্থাপনাটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানা। শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যের সঙ্গে প্রকল্পটিকে যুক্ত করেছে হোয়াইট হাউস।

সোমবার ওভাল অফিসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি মেসাবি মেটালিকসের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আইওয়ার রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন ইস্পাত উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে ২০৩০ সালে।

ট্রাম্প ঘোষণার সময় বলেন, মেসাবি মেটালিকস আইওয়ায় আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানা নির্মাণ করবে। তাঁর প্রশাসন প্রকল্পটিকে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় ইস্পাত সরবরাহ বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। প্রস্তাবিত কারখানাটি শুধু ইস্পাত উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, খনি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত ও উৎপাদনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কাঁচামালের উৎস। কারখানায় ব্যবহারের জন্য লৌহ আকরিক আসবে মিনেসোটায় মেসাবি মেটালিকসের নতুন খনি থেকে। ওই খনি প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ ও ইস্পাত উৎপাদনকে একই সরবরাহব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও এতে রয়েছে।

প্রকল্পটির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিশেষভাবে সামনে এসেছে। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ীভাবে প্রায় ১ হাজার ৭৫০টি চাকরি তৈরি হতে পারে। নির্মাণপর্বে আরও প্রায় ৬ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব চাকরির একটি বড় অংশ উচ্চ মজুরির হতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবা খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রকল্পটির সমর্থকেরা মনে করছেন।

আইওয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রস্তাবিত এই শিল্প প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্যটির গভর্নর কিম রেনল্ডস প্রকল্পটিকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিপথে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে এবং স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে প্রকল্পটি নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ে কোনো কর-সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ঘোষণার সময় পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। আইওয়ার আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এ ধরনের সম্ভাব্য প্রণোদনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানা গেছে। রাজ্যের ডেমোক্র্যাট নেতারা প্রকল্পে সরকারি অর্থ বা সুবিধা যুক্ত হলে তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রকল্পটির মালিকানার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। মেসাবি মেটালিকস যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ভারতের এসার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকায় উৎপাদন’ নীতির সঙ্গে বিদেশি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের এই বড় বিনিয়োগ কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়েও আলোচনার সুযোগ রয়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে অবশ্য প্রকল্পটিকে যুক্তরাষ্ট্রের খনি, রেল, জ্বালানি ও শ্রমশক্তিকে সমন্বিত করে একটি দেশীয় শিল্প সরবরাহব্যবস্থা তৈরির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ট্রাম্প তাঁর শুল্কনীতির সঙ্গেও এই বিনিয়োগের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রশাসন বিদেশি ইস্পাতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ট্রাম্পের বক্তব্য, বিদেশি ইস্পাতের ওপর উচ্চ শুল্ক থাকায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তাঁর প্রশাসন এটিকে দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে, শুল্কনীতির সমালোচকেরা এর ফলে বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামালের ব্যয় বাড়তে পারে বলে যুক্তি দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে কৃষি ও উৎপাদননির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোর ব্যবসায়ীদের জন্য উচ্চ আমদানি ব্যয়ের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক রয়েছে। ফলে নতুন ইস্পাত কারখানা একদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে এর সঙ্গে যুক্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যয় ও সরকারি সহায়তার কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলবে।

এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। আইওয়া ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য হলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে জোরালো হয়েছে। আইওয়ার সিনেট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে এবং অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি প্রতিনিধি পরিষদের আসনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে শিল্প বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।

বিশেষ করে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনকে ঘিরে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের আইওয়া সফর ও শিল্প প্রকল্পের ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে; ফলে কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান, শিল্প বিনিয়োগ ও জীবনযাত্রার ব্যয়—এই তিনটি বিষয়ই আইওয়ার ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

নতুন কারখানাটি বাস্তবে কত দ্রুত নির্মাণ শেষ করতে পারবে এবং ঘোষিত উৎপাদনক্ষমতা কতটা অর্জন করতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। বর্তমানে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে নির্মাণ, অর্থায়ন, অবকাঠামো, পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনসহ একাধিক বিষয় জড়িত থাকবে। ফলে ঘোষণার পরবর্তী কয়েক বছরই প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে আইওয়ায় প্রস্তাবিত ১৫ বিলিয়ন ডলারের ইস্পাত কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পনীতিতে একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে সামনে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ ইস্পাত উৎপাদনের পাশাপাশি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং একটি সমন্বিত খনি-থেকে-ইস্পাত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল, সরকারি প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং স্থানীয় জনগণের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারিত হবে বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর। নির্বাচনের আবহে ঘোষণাটি রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হলেও এর শিল্প ও অর্থনৈতিক ফলাফল পরিমাপের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ হবে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত