প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ইসলামি অর্থায়ন খাতে নতুনভাবে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি খাতের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসি। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে একটি স্বতন্ত্র ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স উইং’-এর মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই অনুমোদনের পরই প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি ব্যবসা শুরু করতে পারবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত বিভিন্ন শর্ত ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে আইপিডিসিকে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা ও পরিসর বাড়তে থাকায় আইপিডিসি ফাইন্যান্সের এই উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত অর্থায়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি ইসলামি নীতিমালা অনুসরণ করে আলাদা অর্থায়ন সেবা চালুর মাধ্যমে নতুন একটি গ্রাহকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে প্রতিষ্ঠানটির জন্য। একই সঙ্গে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের পরিধি বাড়ার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া এক তথ্যের মাধ্যমে আইপিডিসি ফাইন্যান্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অনুমোদন নির্দিষ্ট শর্ত ও নিয়মকানুন প্রতিপালনের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি অর্থায়ন কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে, কিন্তু গ্রাহকদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের সেবা চালুর আগে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।
এর মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানের সংঘস্মারক ও সংঘবিধি বা মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা। ইসলামি অর্থায়ন কার্যক্রমকে প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য এই পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ইসলামি অর্থায়নের ক্ষেত্রে শরিয়াহ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য একটি স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি গঠন করতে হবে।
শুধু আলাদা একটি কমিটি গঠন করলেই প্রক্রিয়াটি শেষ হবে না। আইপিডিসি ফাইন্যান্সকে পৃথক ইসলামিক ফাইন্যান্স বিভাগ বা ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রচলিত অর্থায়ন কার্যক্রম এবং শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থাপনা কাঠামো আলাদা রাখার সুযোগ তৈরি হবে। ইসলামি অর্থায়নের অর্থ ও তহবিলও পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে দুটি ধারার অর্থায়নের মধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক পৃথকীকরণ বজায় থাকে।
এ ছাড়া ইসলামি অর্থায়নের জন্য নির্ধারিত নীতিমালা, কার্যক্রম পরিচালনার নীতিমালা বা অপারেশনাল ম্যানুয়াল এবং পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই আইপিডিসি আনুষ্ঠানিকভাবে শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবসা শুরু করতে পারবে।
এই বিষয়টি গ্রাহকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগত অনুমোদন এবং চূড়ান্ত অনুমোদন এক বিষয় নয়। ফলে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের নতুন ইসলামি অর্থায়ন কার্যক্রম এখনো প্রস্তুতি ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে গ্রাহকদের জন্য নতুন ইসলামি অর্থায়ন পণ্য বা সেবা চালু হওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে ইসলামি অর্থায়নের বাজার অবশ্য এরই মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামি শাখা ও ইসলামি উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মার্চভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর বেশ কয়েকটি ইসলামি শাখা ও উইন্ডোও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে শরিয়াহসম্মত অর্থায়নের জন্য গ্রাহকদের আগ্রহ ও বাজারের পরিসর যে ধীরে ধীরে বাড়ছে, আইপিডিসির উদ্যোগকে সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের জন্য এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো প্রচলিত অর্থায়নের পাশাপাশি নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য তৈরির সম্ভাবনা। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন সেবা দিয়ে থাকে। নতুন ইসলামিক ফাইন্যান্স উইং চালু হলে শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তি, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক গ্রাহকদের জন্য আলাদা সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কী ধরনের পণ্য চালু হবে এবং সেগুলোর কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইসলামি অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু পণ্যের নাম বা কাঠামো পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট লেনদেন, তহবিল ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ এবং পরিচালন প্রক্রিয়াতেও শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। এ কারণেই স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, পৃথক তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং আলাদা হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাঠামো কার্যকর হলে নতুন ব্যবসার স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক তদারকির সুযোগও বাড়বে।
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের আর্থিক অবস্থার দিক থেকেও ২০২৬ সাল প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২০ কোটি ৭০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চতর নিট সুদ আয়, বিনিয়োগ থেকে আয় এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার উন্নতির মতো বিষয় এ সময়ে মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
এমন সময়ে ইসলামি অর্থায়নে প্রবেশের প্রস্তুতি প্রতিষ্ঠানটির পণ্য ও সেবা বৈচিত্র্য আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তবে নতুন ব্যবসার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের শরিয়াহভিত্তিক পণ্য চালু করে, কত দ্রুত কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারে এবং গ্রাহকদের মধ্যে সেই সেবার গ্রহণযোগ্যতা কতটা তৈরি হয় তার ওপর।
গ্রাহকদের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি আগ্রহের। প্রচলিত অর্থায়নের বাইরে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক সেবা চান এমন অনেক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী নতুন এই উদ্যোগের দিকে নজর রাখতে পারেন। বিশেষ করে ইসলামি অর্থায়নের নীতিমালা, চুক্তির ধরন, মুনাফা বণ্টন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে সেবা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি আর্থিক পণ্যের কাঠামো ও চুক্তির শর্ত আলাদা হতে পারে।
সব মিলিয়ে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ইসলামিক ফাইন্যান্স উইং চালুর উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরুর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ, প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পরিবর্তন, পৃথক তহবিল ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং স্বাধীন শরিয়াহ তদারকি কাঠামো গঠনের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে প্রতিষ্ঠানটি। সেই অনুমোদন পাওয়ার পরই আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তুতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রক্রিয়ার দিকেই থাকবে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও আর্থিক খাতের নজর।